Showing posts with label স্বাস্থ্য. Show all posts
Showing posts with label স্বাস্থ্য. Show all posts

Saturday, July 15, 2017

মশা তাড়াতে বাসায় প্রাকৃতিক উপায়



মশা নিয়ে সবাই চিন্তিত। মশা তাড়ানোর দায়িত্ব নাগরিকের !!! তাই ভাবলাব কিছু প্রাকৃতিক উপায় খুজে দেখি। ইন্টারনেটে গেটে কিছু তথ্য পেলাম পরীক্ষা করা হয়নি, নিজ দায়িত্ব প্রয়োগ করবেন!!!
নিম তেল
নিম তেল আর নারকেল তেল সম পরিমাণে মিশিয়ে শরীরের খোলা অংশে মেখে নিন। এবার সব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে ঘুমিয়ে পড়ুন।কারণ শরীর থেকে যে গন্ধ বের হয় তা মশা দূরে রাখতে দারুন কার্যকর।অন্তত আট ঘণ্টা আপনার কাছে মশাকে ভিড়তে দিবে না।

ইউক্যালিপটাস-লেবু তেল
ইউক্যালিপটাস আর লেবু তেলে একধরনের উপাদান পাওয়া যায় যার নাম ‘cineole’। সম পরিমাণে ইউক্যালিপটাস আর লেবু তেল ভাল করে মিশিয়ে নিন। এবার গায়ে মেখে নিলে যে যেকোনো পোকামাকড় আপনার থেকে দূরে থাকবে।সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে মশা তাড়াতে এই উপকরণের জুড়ি নেই।

রসুন
মশা তাড়ানোর অন্যতম উপাদান হচ্ছে রসুন। রসুনের শক্তিশালী এবং তীব্র কটু গন্ধই মশার কামড় থেকে বাঁচতে এবং ঘরকে মশা মুক্ত করতে যথেষ্ট উপকারী ভূমিকা রাখে। কিছু রসুনের কোষ নিয়ে তা পানিতে সেদ্ধ করে সেই পানি পুরো ঘরে স্প্রে করে দিতে হবে। মশা থেকে দূরে থাকতে চাইলে নিজের শরীরেও এই পানি স্প্রে করা যেতে পারে।

লেবুর তেল
সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (CDC) দ্বারা স্বীকৃত লেবু এবং ইউক্যালিপটাস তেলের মিশ্রন প্রাকৃতিক ভাবে মশাকে দূরে রাখতে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। লেবুর তেল এবং ইউক্যালিপটাস তেলের মধ্যে cineole নামক একটি কার্যকরী উপাদান রয়েছে যা ত্বকে অ্যান্টিসেপ্টিক এবং ইনসেক্ট রিপিলেন্ট হিসেবে কাজ করে। সমান অনুপাতের ইউক্যালিপটাস তেল এবং লেবুর তেলের মিশ্রন গায়ে লাগিয়ে রাখলে মশা দূরে থাকবে।

পুদিনা
বায়োরিসোর্স টেকনোলোজির জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষনায় দেখা গেছে, যে পুদিনার তেল এবং পুদিনার নিষ্কর্ষ ইনসেক্ট রিপিলেন্ট হিসাবে ভালো কাজ করে। পুদিনা পাতাকে বাষ্পায়িত করে পুরো ঘরে বাষ্প ছড়িয়ে এবং পুদিনার তেল শরীরে মেখে মশা থেকে বাঁচা যায়। পুদিনা গাছ জানালার পাশে লাগানো যেতে পারে। তাছাড়া পুদিনা ফ্লেভারসমৃদ্ধ মাউথ ওয়াশ পানির সাথে মিশিয়ে ঘরের চারিদিকে স্প্রে করলে মশা দূরে থাকবে।

তুলসি
প্যারাসাইটোলোজি রিসার্চ জার্নালের প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, মশার শুককীট মারতে এবং মশাকে দূরে রাখতে তীব্র ভাবে কাজ করে তুলসী। ঘরের বারান্দায় অথবা জানালার পাশে তুলসী গাছ লাগিয়ে নিলে মশা থেকে নিশ্চিন্তে থাকা যায়। এই গাছের মধ্যে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যার জন্য মশা ঘরের ভিতর আসবে না।

চা গাছের তেল
ত্বক ও চুলের জন্যও চা গাছের তেলের যথেষ্ট পরিমাণ ভালো দিক রয়েছে। তাছাড়াও এর মধ্যে রয়েছে শক্তিশালী অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল এবং অ্যান্টি ফাঙ্গাল উপাদান। চা গাছের তেল মশাকে দূরে রাখার ক্ষেত্রেও অসাধারন কাজ করে। এর তীব্র গন্ধ, অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল এবং অ্যান্টি ফাঙ্গাল বৈশিষ্ট্য মশা থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করে। চা গাছের তেল শরীরে মেখে অথবা এর কিছু ড্রপ বাষ্পায়িত হিসাবে ব্যবহার করলে বাতাসের মধ্যে চা গাছের তেলের গন্ধ বিরাজ করবে এবং মশাকে দূরে রাখবে।

নিমের তেল
মানব দেহের জন্য নিমের অনেক গুলো ভালো দিক রয়েছে। মশা বিতাড়ক হিসাবেও নিমের যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। অ্যামেরিকান মসকিউটো কন্ট্রোল এসোসিয়েশনের(১) একটি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে যে, নারিকেল তেলের সাথে নিমের তেলের ১:১ অনুপাতের মিশ্রণ মশা তাড়ানোর একটি কার্যকরী উপায়। নিমের মধ্যে রয়েছে শক্তিশালী অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল, অ্যান্টি-ফাঙ্গাল, অ্যান্টি-ভাইরাল এবং অ্যান্টি-প্রটোজোয়াল যা চামড়ায় এক ধরনের মশা বিতাড়ক গন্ধ সৃষ্টি করে। সমান পরিমানের নিমের তেল এবং নারিকেল তেলের মিশ্রন দেহের বহিরাংশে লাগালে মশার কামড় থেকে আট ঘন্টা সুরক্ষা পাওয়া যাবে।

কর্পূর 
মশা তাড়াবার আরেকটি উপায় হলো কর্পূর। কর্পূরের ব্যবহার মশা বিতাড়ক হিসাবে চমৎকার কাজ করে। অন্যান্য প্রাকৃতিক সমাধানের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী কার্যকরী উপাদান হচ্ছে কর্পূর। খুবই অল্প পরিমাণ কর্পূর ঘরের একটি নির্দিষ্ট স্থানে রেখে দিয়ে ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে রাখতে হবে ১৫-২০ মিনিট, তাহলে পুরো ঘর মশা মুক্ত হয়ে যাবে।

মশার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে অস্বাস্থ্যকর রাসায়নিক মশা নিধন পন্য ব্যবহার করে মশা তাড়ানোর চেষ্টা না করে উপরের পদ্ধতিগুলো মানা খুবই স্বাস্থ্যকর এবং এগুলো আমাদের হাতের কাছেই থাকে।

লেমন থাইম: বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, লেমন থাইমের পাতা গুঁড়া করে ঘরে রাখলে মশার উপদ্রব ৬২ ভাগ পর্যন্ত কমানো যায়।
ল্যাভেন্ডার: শুধু মশা তাড়ানোর জন্য নয়, ল্যাভেন্ডারের রয়েছে আরও প্রচুর গুণ। উত্কণ্ঠা, ব্যথা উপশম, শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যাতেও দারুণ উপকারী ল্যাভেন্ডার।
লেমন বাম: লেবু পাতার সুগন্ধ যেমন মশা তাড়াতে সাহায্য করে, তেমনই এই গাছের পাতা দিয়ে তৈরি হার্বাল চা হজমের সমস্যা, ঘুমের সমস্যাতেও উপকারী। তাই বাসার বারান্দায় বা ঘরে লাগাতে পারেন।
তুলসি: নতুন করে তুলসির গুণের কথা বলার প্রয়োজন নেই। তুলসি মশা তাড়াতে সাহায্য করে।

লেমন গ্রাস: এক জাতীয় ঘাস। এই ঘাসের মধ্যে থাকে ন্যাচারাল অয়েল সিনট্রোনেলা, যা মশা তাড়ানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। বাসায় লেমন গ্রাস লাগালে তাই রেহাই পেতে পারেন মশার হাত থেকে।
ক্যাটনিপ: এই পুদিনা জাতীয় গাছকে বলা হয় মশার যম। যে কোনও মসকিউটো রিপেলেন্টের থেকে ১০ গুণ বেশি শক্তিশালী ক্যাটনিপ।

রোজমেরি: বাসায় যদি রোজমেরি গাছ লাগান তাহলে মশার হাত থেকে রেহাই তো পাবেনই, সঙ্গে জুটবে আরও অনেক উপরি পাওনা। সুগন্ধী রোজমেরি শুঁকলে স্মৃতিশক্তি ও মনোসংযোগ বাড়ে। ঔষধী গুণও রয়েছে রোজমেরির। ব্যবহার করতে পারেন রান্নাতেও।

রসুন: রান্নায় স্বাদ বাড়ায়, ইনফেকশন সারাতে সাহায্য করে, রসুনের এই গুণগুলো তো জানতেন। কিন্তু জানতেন কি বাড়িতে রসুন গাছ লাগালে মশার উপদ্রবে থেকেও রেহাই পাওয়া যায়?

গাঁদা: এই ফুল লাগালে শুধু যে দেখতে সুন্দর লাগে তাই নয়, পোকামাকড়ও থাকে শতহাত দূরে। গাঁদা গাছে থাকা পাইরেথ্রামের গন্ধ পোক-মাকড়, মশা সহ্য করতে পারে না। বাগানের চারপাশ জুড়ে লাগাতে পারেন গাঁদা গাছ। শোভাও বাড়বে, মশাও হবে না বাড়িতে।
Source: 
http://www.newsbangladesh.com/details/54374
http://bonikbarta.net/bangla/news/2017-03-08/109249/%E0%A6%97%E0%A6%BE%E0%A6%9B-%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A7%9C%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A7%87--%E0%A6%AE%E0%A6%B6%E0%A6%BE!/
https://amarhealthbd.wordpress.com/2015/05/05/%E0%A6%AE%E0%A6%A5%E0%A6%BE-%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A7%9C%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%8B%E0%A6%B0-%E0%A6%AA%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%A7%E0%A6%A4%E0%A6%BF/
http://amradhaka.com/solution/%E0%A6%AE%E0%A6%B6%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A7%9C-%E0%A6%A5%E0%A7%87%E0%A6%95%E0%A7%87-%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%87-%E0%A6%AA%E0%A7%87%E0%A6%A4%E0%A7%87.html

Thursday, October 20, 2016

জনস্বাস্থ্যকে প্রধান্য দিয়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো জরুরি

জনস্বাস্থ্যকে প্রধান্য দিয়ে
স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো জরুরি

সাম্প্রতিক সময়ে সরকার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন নতুন বিভাগ তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে,  জনগনের স্বাস্থ্য রক্ষায় সরকারের এ ধরনের পরিকল্পনা প্রশংসনীয়। তবে এ  পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আলোচনা শুধুমাত্র জনসেবক ও জনপ্রতিনিধিদের মাঝে সীমাবদ্ধ না রেখে, জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের লক্ষ্যে কার্যরত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাথে আলোচনা করা প্রয়োজন। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে সরকারে চিকিৎসা কেন্দ্রিক, বর্তমানে মানুষের স্বাস্থ্য ও রোগের প্রকৃতি বিবেচনা করে সরকারকে জনস্বাস্থ্য বিষয়টি অগ্রাধিকার দেয়া জরুরি। আর এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারের উচিত একটি জনস্বাস্থ্য বিভাগ গঠন করা।

বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশ সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে অনেকাংশে সফল হয়েছে, যা বিশ্বে একটি দৃষ্টান্ত। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগ (হৃদরোগ, ষ্ট্রোক, ক্যান্সার, ডায়বেটিস) বেড়ে গেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৬০% হয় অসংক্রামক রোগে। আমাদের আজকের আলোচনায় বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের রোগ আর মৃত্যু অবস্থা, সরকারী-বেসরকারী চিকিৎসা সেবার প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে আগামী বছরের বাজেট এবং স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রমকে মূল্যায়ণ করার চেষ্টা করবো।

বাড়ছে অসংক্রামক রোগ,

২০১০ সালে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের ৯৮.৭% এর মধ্যে অন্তত একটি অসংক্রামক রোগের (হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সার, ডায়বেটিস) ঝুঁকি (ৎরংশ ভধপঃড়ৎ), ৭৭.৪% এর মধ্যে অন্তত দুটি ঝুঁকি এবং ২৮.৩% এর মধ্যে অন্তত তিনটি ঝুঁকি রয়েছে। বাংলাদেশে  প্রায় ১২ লক্ষ ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগী রয়েছে। প্রতিবছর ২ লক্ষ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় এবং ১.৫ লক্ষ মানুষ মারা যায়। জাপানিজ জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজি (জেজেসিও)-র তথ্য অনুসারে বাংলাদেশে ১ কোটি ২৭ লাখ মানুষের দেহে অস্বাভাবিক কোষের বৃদ্ধি ঘটে চলেছে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যা নিওপ্লাসিয়া নামে পরিচিত। এ অবস্থা চলতে থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ ক্যান্সারের ঝুঁকিতে থাকবে ২ কোটি ১৪ লাখ মানুষ।

ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিক ফেডারেশনের ২০১৫ সালের গবেষণা অনুসারে বাংলাদেশে মোট ডায়াবেটিস আক্রান্ত  রোগীর সংখ্যা ৭১ লাখ। এর মধ্যে মোট পাঁচ শতাংশ শিশু ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। বাংলাদেশে মোট ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের মধ্যে পাঁচ শতাংশ হলো টাইপ টু ডায়াবেটিস, প্রধানতই শিশুরাই এর শিকার। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের কারণে ৩,৮২০০০ মানুষ পঙ্গু হয় এবং ৫৭ হাজার মানুষ মারা যায়। বর্তমানে দেশে ২ কোটি মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত। ক্রমান্বয়ে বাড়ছে এ সংখ্যা। যথাযথ চিকিৎসাসেবা দেয়া যায় মাত্র কয়েক হাজার রোগীকে। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নেওয়া রোগীর পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় যে, হৃদরোগের প্রকোপ বাড়ছে। ২০০৯ সালে জাতীয় এই হাসপাতালের বহির্বিভাগে ১ লাখ ৬০ হাজার ৮ জন চিকিৎসা নেয়। ২০১৪ সালে বহির্বিভাগে রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৫৩৩ জনে।

স্বাস্থ্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক জার্নাল ল্যানচেটে বলা হয়- ২০১৩ সালে ১ লাখ ৭৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় স্ট্রোকে এবং ১ লাখ ৬ হাজার মানুষ হার্ট অ্যাটাকে ও ২৮ হাজার মানুষ উচ্চ রক্তচাপজনিত হৃদরোগে মারা যান। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপ থেকে জানা যায়, ১৯৯০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন রোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মানুষের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী মানুষের মৃত্যুর প্রধান দুটি কারণের একটি হৃদরোগ।

বাংলাদেশ প্রায় সোয়া দুই কোটিরও বেশি মানুষ মানসিক রোগে আক্রান্ত। ২০১১ সালে মানসিক রোগীর সংখ্যা ছিল দেড় কোটি।  আরেকটি গবেষণার তথ্য, ১৮ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে মানসিক রোগীর সংখ্যা ১৮%। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)-র সমীক্ষায় দেখা যায় ৭-১৫ বছরের বয়সী শিশু-কিশোরদের ০৮% একাকি থাকতে পছন্দ করে, যার সংখ্যা ৩২ লাখ (দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ধরে)। শিশু-কিশোরদের এই একাকিত্ব তাদেরকে সামাজিক নানা অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিবে, যা আমরা ইদানিং কালে অনেক বেশী দেখতে পাচ্ছি।

অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ যোগ্য, চাই প্রতিরোধের ব্যবস্থা

স্বাস্থ্য সেবাকে শুধু চিকিৎসাকেন্দ্রিক করার কারণে এবং রোগ প্রতিরোধে সম্পুর্ণ উদাসীন নীতির কারণে মরনঘাতি অ-সংক্রামক রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর প্রতিকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে সম্পুর্ণভাবে নেই কিন্তু সরকারের সার্বিক রোগ প্রতিরোধ নীতি থাকলে সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগকে স্বাস্থ্য সেবার আওতায় সম্ভব। আমরা জানি, দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া নগরায়ন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস, শরীরচর্চা বা ব্যায়াম বা পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অতিরিক্ত মোটা হওয়া, অনিয়ন্ত্রিত মাদক সেবন এবং ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার, পরিবেশ দূষণ, অনিরাপদ খাদ্য অসংক্রামক রোগ সৃষ্টির অন্যতম কারণ।

খাদ্য মানুষের সুস্থ্য থাকার একটি অন্যতম প্রধান শক্তি। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৪৫ লক্ষ লোক খাদ্যে বিষস্ক্রিয়ায় আক্রান্ত   হয়ে বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ২০১৪ সালে একই জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের আওতায় জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত খাদ্য নিরাপত্তা গবেষণাগারে দেখা যায় ৪০ শতাংশ খাদ্যেই মানবদেহের জন্য সহনীয় মাত্রার চেয়ে ৩ থেকে ২০ গুণ বেশি বিষাক্ত উপাদান শনাক্ত হয়। এসব খাদ্যে নিষিদ্ধ ডিডিটি থেকে শুরু করে রয়েছে কার্বামেড, কার্বাইড, অ্যালড্রিন, ক্রোমিয়াম, আর্সেনিক, সিসা, ফরমালিনসহ আরো বেশ কিছু রাসায়নিক-ধাতব মিশ্রণের উপস্থিতি । এ সকল উপাদন শরীরে ক্যান্সারসহ নানা রোগের অন্যতম কারণ।

বাজারের চিপস, ওয়েফার, চকোলেট ও জুসে কার্বোহাইড্রেড, মেলামিন অতিমাত্রায় থাকায় শিশুদের জন্য ক্ষতিকর হলেও এসব খাবারের প্রতি তাদের আকৃষ্ট করে তোলা হচ্ছে। বর্তমান সময়ে বেশিরভাগ শিশুরা স্থূলতা ও উচ্চরক্ত চাপে ভুগছে, যার প্রধান কারণ শিশুদের এসব বাইরের খাবার খাওয়া। স্থূলতা ও উচ্চরক্ত চাপ ছাড়াও কিডনি, লিভার, ফুসফুসসহ নানা রোগে আক্রান্ত  হচ্ছে শিশুরা। এতে তারা প্রচন্ড স্বাস্থ্য হুমকিতে পড়ছে।

কায়িক পরিশ্রম ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য হাঁটা একটি উত্তম মাধ্যম। ডাব্লিউবিবি ট্রাস্ট-র গবেষণায় দেখা যায় ঢাকা শহরের ৪৪ % রাস্তায় ফুটপাত নেই এবং ৫৬% ফুটপাত হাঁটার উপযোগী নয়।  একটি সুন্দর ও পরিকল্পিত নগরের বাসিন্দাদের জন্য নগরের মোট আয়তনের ১০ শতাংশ খোলা মাঠ ও পার্ক থাকা প্রয়োজন। কিন্তু ঢাকায় এ জন্য আছে মাত্র চার শতাংশ জায়গা। । রাজধানীতে গড়ে দুই লাখ ৩০ হাজার ৭৬৯ জন মানুষের জন্য খেলার মাঠ আছে মাত্র একটি। আর অপ্রতুল হলেও এ পার্কগুলোও এখন দখল ও অব্যবস্থাপনার কারণে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

শিশু-কিশোরদের জীবনচর্চা ও রোগ সমীক্ষায় দেখা যায়, সময়মতো খাবার খায় না ৭৪ শতাংশ, পড়ার টেবিল, বইখাতা গুছিয়ে রাখে না ২২ শতাংশ, দাঁত ব্রাশ করে না ৪ শতাংশ, শরীরচর্চা বা ব্যায়াম করে না ৫৯ শতাংশ, কাপড়চোপড় নিজে পরিষ্কার করে না ৫৯ শতাংশ, মা-বাবার কাজে সহযোগিতা করে না ১৮ শতাংশ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব মতে, প্রতি বছর কমপক্ষে ২৮ লাখ মানুষ অধিক ওজন এবং স্থুলতার কারণে মারা যান। গবেষণার আওতাভুক্ত ১৬ হাজার ৪৯৩ জন নারীর মধ্যে ১৮ শতাংশই অধিক ওজনের অধিকারী অথবা স্থুল। স্থুলতার কারণে তারা ডায়াবেটিস এবং অ্যান্ডমেট্রিয়াল ক্যান্সার, জরায়ু-মুখ ক্যান্সার,  স্তন ক্যান্সার, ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের মতো বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হওয়ার অনেক বেশি ঝুঁকিতে থাকে বলে প্রমাণিত। গ্রামীণ এলাকার চেয়ে শহুরে এলাকায় স্থুলতা এবং অধিক ওজনের প্রাদুর্ভাব বেশি। ঢাকায় বায়ু দূষণে মরছে বছরে ১৫ হাজার মানুষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) এক রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে দুষিত ২৫ শহরের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের তিনটি শহর নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও ঢাকা।

উপরের এ তথ্যগুলো সুপষ্টভাবেই বুঝিয়ে দেয় এমহুর্তে জনস্বাস্থ্য রক্ষায় রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতি সরকারের মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে যে পরিমান চিকিৎসা সেবা বরাদ্ধ ও কার্যক্রম রয়েছে, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় সে ধরনের কোন গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না।

চিকিৎসা ব্যয়ে বিপর্যস্ত মানুষ

চিকিৎসা করাতে গিয়ে বাংলাদেশে প্রতিবছর ৬.৪ মিলিয়ন বা ৪ শতাংশ মানুষ দরিদ্র হয়ে যাচ্ছে।  দেশের শতকরা ৭৫ শতাংশ কিডনি রোগী ব্যয়বহুল কিডনী রোগের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে সমর্থ হন না। বাংলাদেশ ১২ লক্ষ ক্যান্সার রোগী থাকলেও, সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা পায় মাত্র ১ লক্ষ লোক। ২০০০ সালের তথ্য অনুসারে চিকিৎসা ব্যয়ের ৬০ ভাগ মানুষের নিজের পকেট হতে যায়। স্বাস্থ্য ব্যয় মেটাতে জনগনের অন্যান্য অত্যাবশকীয় জিনিসের উপর চাপ ফেলছে।

গরীব মানুষের জন্য চিকিৎসার ব্যয়ের বোঝা বহন করা অনেক কঠিন। সামগ্রিকভাবে পরিবারের আয়ের ৮.৮ শতাংশ চিকিৎসার জন্য ব্যয় হয়। কিন্তু গরিবের বেলায় দেখা যায় এর অনুপাত প্রায় ৩৮ শতাংশ। হাসপাতালে ভর্তি, অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে অনেক দরিদ্রই হয় ঋণগ্রস্ত হয় বা জমিজমা বিক্রি করে। হাসপাতালে ভর্তি হলে দরিদ্রদের খরচ আরো বেড়ে যায়। কেননা একদিকে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ে, আর কাজ করতে না পারায় আয় কমে যায়।

সাধারণ মানুষের চিকিৎসার আশ্রয়স্থল সরকার পরিচালিত  স্বাস্থ্য সেবা
সরকার পরিচালিত  হাসপাতালগুলোর সেবার মান ও দুনীতি নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকলেও এ কথা অস্বীকার করার কোন অবকাশ নেই দেশের সাধারণ মানুষগুলোর আশ্রয়স্থল হচ্ছে এ সকল হাসপাতাল। স্বাস্থ্য বুলেটিন এর তথ্য অনুসারে ২০১২ সালে বর্হিভিাগে সেবা নিয়েছে ১৩ কোটি ৮২ লাখ ৮১ হাজার ১১৪ জন এবং ভর্তি হয়েছিল ৪৫ লাখ ৬৪ হাজার ৩১৮ জন রোগী। স্বাস্থ্য বুলেটিন ২০১৫ তথ্য অনুসারে ২০১৪ সালে ভর্তিকৃত ভোট রোগীর সংখ্যা ৫১ লাখ ৯৪ হাজার ৪৭০ জন। কমিউনিটি হাসপাতালে প্রতিমাসে ৯০ লক্ষ মানুষ চিকিৎসা সেবা নেয়। তবে রেফারেল ব্যবস্থা না থাকা, ডাক্তারের অনুপস্থিতি, ঔষধের অভাব, নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি নষ্ট, অপরিচ্ছন্নতা, হাসপাতালে কর্মীদের দূব্যবহারের কারণে সরকারী চিকিৎসার ব্যবস্থা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠে থাকে। এছাড়া মহানগর এবং বিভাগীয় পর্যায়ে সরকার পরিচালিত চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তোলা ও বরাদ্ধ বৃদ্ধির কারণে মানুষের স্বাস্থ্য সেবা ব্যহত হচ্ছে। শুধুমাত্র ঢাকা বিভাগে রয়েছে ৪৮টি সেকেন্ডারী ও টারশেয়ারী হাসপাতাল।  আর এ অবস্থার প্রেক্ষিতে দেশের সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্য সেবা হতে বঞ্চিত হচ্ছে।

বেড়ে যাচ্ছে বাণিজ্যিক বেসরকারী চিকিৎসা ব্যবস্থা
১৯৮২ সালে একটা অধ্যাদেশ জারীর মাধ্যমে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতকে আইনী বৈধতা দেওয়া হয়।  ১৯৮০ সালে সরকারী পরিচালনায় রাষ্ট্রায়াত হাসপাতাল ছিল ৫১০ টি এবং বেসরকারী ছিল ৩৯ টি, ১৯৯৮ সালে সরকারী হাসপাতালের সংখ্যা বেড়ে ৬৪৭ টি এবং বেসরকারী হাসপাতালের সংখ্যা দাড়ায় ৬২৬টি। ২০০৫-০৬ সালে এক তথ্যে দেখা যায মোট ৪ হাজার ১৫টি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের মাঝে ২ হাজার ১৬৮টি একক মালিকানায়  প্রতিষ্ঠিত। বর্তমানে  বাংলাদেশে ১৩৩৪১ টি প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিস ও ডায়গোনেসটিক সেন্টার আছে। সঠিক পরিসংখ্যান নেই।  স্বাস্থ্যখাত একটি বিশাল বানিজ্যিক খাত। ২০০৯ সালে প্রকাশিত এক তথ্যে দেখা যায় ৮ বছরে বেসরকারী চিকিৎসালয়ের আয় বেড়েছে ৫৩৬ শতাংশ, দিন দিন এর পরিমান বাড়ছে।

বেসরকারী চিকিৎসার উন্নয়নের লক্ষ্যে  ‘‘বেসরকারি চিকিৎসা সেবা আইন ২০০০’’ খসড়া প্রণয়ন করা হয়। আইনটি ২০০৩ ও ২০০৪ সালে আরো অধিকতর উন্নয়ন করে। ২০১০ সালে  “বেসরকারি স্বাস্থ্য সেবা আইন-২০১০’’ (খসড়া) নিয়ে আবার কিছুটা কাজ হয়। বর্তমানে  ‘‘বেসরকারী চিকিৎসা সেবা আইন-২০১৬’’ এর খসড়ার উপর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কাজ করছে। বিগত ১৬ বছরে আইনটি আলোর মূখ দেখেছি, আর এ পিছনে স্বাস্থ্য বানিজ্যের সাথে জড়িত ব্যক্তিরা রয়েছে। বর্তমানেও শুধুমাত্র চিকিৎসকদের প্রত্যক্ষ প্রভাবে আইনটি পর্যালোচনা কাজ চলছে। এ ক্ষেত্রে জনস্বার্থ কতটুকু রক্ষা পাবে বা একটি বড় প্রশ্ন।

ঔষধ বানিজ্য
স্বাস্থ্যখাতে অপর এক অনিয়ন্ত্রিত অবস্থার নাম ঔষধ বানিজ্য। ঔষধ বানিজ্যের চিত্র পাওয়া যায়, ডাঃ মুনির উদ্দিন আহমদ এর লেখায় ‘‘১৯৮১ সালে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায়  জাতিসংঘের শিল্প উন্নয়ন সংস্থা বাজারজাতকৃত ২ লাখ ওষুধ থেকে মাত্র ২৬টি ওষুধের একটি তালিকা প্রকাশ করে যেগুলোকে অপরিহার্য বলে বিবেচনা করা হয়।

অধ্যাপক মোঃ সায়েদুর রহমান, ফার্মাকোলজি বিভাগ, বিএসএমএমইউ-র মতে মানুষের চিকিৎসার জন্য খরচ করার ৩ টাকার মধ্যে ২ টাকা ব্যয় করে ঔষধে। বাংলাদেশে ঔষধের বাজার প্রায় ১৬০০০ কোটি টাকার। সরকার ঔষধের জন্য ব্যয় করে ৬৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১৫৩৫০ কোটি টাকার ঔষধ মানুষকে কিনতে হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রায় ১১০০ জেনরিক ঔষধের ২৪০০০ হাজার ব্রান্ড নাম রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংখ্যার মতে যে ঔষধ ব্যবহার হয় তার ৫০% প্রেসক্রিপশন বা ডিসপেন্সিং বা বিক্রি পর্যায়ে অযৌক্তিক/ভুল/ অসম্পূণ হয়ে থাকে। দেশে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার ঔষধ নিম্ন মানের। সরকার যদি মাত্র ৩০০০ কোটি টাকা ব্যয় করে, তবে সরকার পরিচালিত হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণকারী ব্যক্তিদের আর বাইরে হতে ঔষধ কিনতে হবে না।

জনস্বাস্থ্য ও বাজেট
বাংলাদেশের বর্তমান রোগ ও মৃত্যু পরিমাণ, কারণ এবং প্রকৃতি, চিকিৎসা ব্যয় ইত্যাদি বিশ্লেষণ করলে কতিপয় বিষয় সুপষ্ট হয়।
প্রথমত: বাংলাদেশে প্রতিরোধযোগ্য রোগ ও মৃত্যুর বাড়ছে, দ্বিতীয়ত: চিকিৎসা ব্যয়ের কারণ মানুষ সর্বশান্ত হচ্ছে। এর জন্য প্রয়োজন রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থাকে প্রধান্য দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম গড়ে তোলা। এর পক্ষে বেশ কিছু আইন ও নীতিমালা রয়েছে যা প্রয়োগ করলে অ-সংক্রামক রোগ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে।

বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে আইন ও নীতিমালা পর্যালোচনা সংক্রান্ত এক প্রকাশনা অনুসারে নিরাপদ খাদ্য, পরিবেশ সংরক্ষন, মাদক নিয়ন্ত্রণ, তামাক নিয়ন্ত্রণ, কায়িক পরিশ্রম নিশ্চিতের লক্ষ্যে বাংলাদেশে প্রায় ৯টি নীতিমালা এবং ১৭ টি আইন রয়েছে। কিন্ত এ সকল আইন প্রয়োগে  যথেষ্ট গুরুত্ব না পাওয়ায় জনস্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩, পরিবেশ সংরক্ষন আইন ১৯৯৫, পরিবেশ আদালত আইন ২০১০, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯, খেলার মাঠ, উম্মুক্ত স্থান, উদ্যান এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষন আইন ২০০০, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫ এর মতো জনস্বাস্থ্যের সাথে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলোর বাস্তবায়নে যথেষ্ট ধীর এবং আশানুরূপ নয়। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় জড়িত রয়েছে এ সকল আইন বাস্তবায়নে সাথে। সকলের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করলে বিদ্যমান ব্যবস্থাপনা ও অর্থের মাধ্যমে অনেক সাশ্রয়ীভাবে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করা সম্ভব।

বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবার সমস্যা :  বাজেটে অর্থবৃদ্ধি কি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবে না চাই সঠিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা
রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রধান্য না দেয়া, স্বাস্থ্যখাতের দুনীতি ও অপব্যয়, নিয়ন্ত্রণহীন বেসরকারী চিকিৎসা ও ঔষধ বানিজ্য এ সকল বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ না করে প্রতিবছর বরাদ্ধ বাড়ালেই জনগণের স্বাস্থ্যসেবা বৃদ্ধি হবে না। স্বাস্থ্য সেবার কোন খাতে বরাদ্দ প্রয়োজন তার কোন মূল্যায়ন না করে এবং প্রয়োজনের প্রতি গুরুত্ব না দিয়ে ‘ প্রতিবারের মতোই এবারও টাকার অংক বাড়িয়ে অবকাঠামো ও চিকিৎসার নির্ভর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তবে তামাকজাত দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, ক্যান্সার, কিডনী, লিভার সিলোসিস, স্ট্রোক, জন্মগত হার্ট ডিজিজ রোগীদের জন্য বরাদ্ধ বৃদ্ধি প্রশংসার দাবিদার। তবে মাতৃত্বকালীন ভাতা, প্রতিবন্ধীদের ভাতা, দেয়ার কাজ স্বাস্থ্য বাজেটের অংশ নয়, এটা সমাজকল্যানের কাজ।

বিগত বছরগুলোতে বাজেটে টাকার অংকে বরাদ্ধ বেড়েছে, আর স্বাস্থ্য অধিকার কর্মী হিসেবে আমরা হিসেবে করেছি অনুপাত। কিন্তু বড় হওয়া টাকার অংক এখনো একটি ক্ষেত্রে ও  মানসম্মত স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে পারেনি। অবকাঠামো, পরীক্ষা নিরীক্ষার মেশিন, ঔষধ ক্রয়ের মতো খাতগুলোতে অবিরাম দুনীতি আর অব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রচুর টাকা প্রতিবছর যাচ্ছে কিছু মানুষের পকেটে। বরাদ্ধ যত বাড়ছে বাড়ছে দুনীতি, অপব্যয়ও তাল দিয়ে বাড়ছে।। আর তাই বরাদ্ধকৃত টাকা সঠিক ব্যবস্থাপনার প্রতি নজর দেয়া জরুরি। যে পরিমান বরাদ্ধ বিগত ৫ বছরে হয়েছে সে  সকল খাতের সঠিক ব্যবহার হয়েছে কিনা তা নিরীক্ষা, আগামী দিনের উপকরণ ক্রয় বা অবকাঠামো নির্মাণের খাতের ব্যয়ের প্রয়োজনীয়াত কঠোরভাবে নিরীক্ষা করা জরুরি।

স্বাস্থ্য আন্দোলন জনগণের স্বাস্থ্য সবার মান বাড়ানো এবং যারা স্বাস্থ্য সেবা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়ে আছেন সেসব এলাকা ও মানুষের জন্যে বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবী করছে।  স্বাস্থ্য বাজেটের ক্ষেত্রে সরকারের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রধান্য দেয়ার পাশাপাশি দেশের প্রতিটি এলাকার চাহিদা নিরুপন এবং বরাদ্ধ ব্যবস্থা চালু, সরকারের রেফারেল ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, ওষুধ উৎপাদন, মূল্য, ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজানো; উপকরণ ক্রয় বা অবকাঠামো নির্মাণের খাতের ব্যয়ে মনিটরিংসহ মতো খাতগুলো ব্যবস্থাপনার লক্ষে বরাদ্ধ ও মনোযোগী হওয়া জরুরি।

Monday, February 22, 2016

বৈষম্যহীন কল্যাণকর রাষ্ট্র আমার বাংলাদেশ

বৈষম্যহীন কল্যাণকর রাষ্ট্র আমার বাংলাদেশ
এডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম, আইনজীবী ও নীতি বিশ্লেষক

ছোট ছোট পায়ে পথ ধরে স্কুলে যাওয়া, সুস্বাস্থ্য আর জ্ঞান মেধায় বেড়ে উঠা পিছনে রয়েছে এই রাষ্ট্রের  লক্ষ কোটি সাধারণ মানুষের কষ্টের টাকায় গড়ে উঠা প্রতিষ্ঠান আর অবকাঠামো। অপেক্ষকৃত অনেকটা সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে আমরা অনেকেই প্রশ্ন করি, দেশ আমাকে কি দিয়েছে? অথচ প্রশ্নটা করা উচিত আমরা দেশকে কি দিয়েছি? দেশের মানুষের জন্য কতটুকু করেছি সেই প্রশ্নটাও একবার নিজেকে করা উচিত।

দেশ অনেক এগিয়েছে, দেশ এগিয়ে যাবে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য, অর্থনীতিসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক সুচকে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্ত এ সকল অর্জনে সুবিধা কত শতাংশ মানুষ ভোগ করছে, তা বিশ্লেষণ ও নির্ধারণ করে আগামী দিনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। যদি সম্পদের বন্টনের বৈষম্য অব্যাহত থাকে, তবে এ রাষ্ট্রের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে।  সুচকে আমাদের উন্নয়ন হলেও সম্পদের বন্টনের ক্ষেত্রে আমাদের সুবিধাভোগীদের মানসিক দারিদ্রতা এখনো রয়ে গেছে।

নগরগুলোতে একটি বড় অংশের মানুষ বস্তিতে থাকে। নদীভাঙ্গন বা অর্থনৈতিক সুবিধার লক্ষ্যে এই নগরে আসে। চরম দরিদ্রতার সাথে রয়েছে পানি, আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সমস্যা। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্রের অর্থে কম দামে জমি কিনে ক্ষমতাবান প্লট তৈরি করে দিয়েছে। এ নগরে ক্ষমতাবানদের জন্য একের পর এক আবাসন প্রকল্প তৈরি হলেও,  দরিদ্র বস্তি বাসীদের জন্য কোন  কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। আবাসনের এই বৈষম্য অবসান করা জরুরি।

এই নগরে লক্ষ লক্ষ শিশু রয়েছে। কিন্ত এ শিশুদের খেলাধুলা ও বিনোদনের জন্য নেই পর্যাপ্ত জায়গা। ফুটপাতে প্রায় ২ লক্ষের বেশি স্থায়ী হকার রয়েছে,  যাদের উপর ১৪ লক্ষ মানুষের জীবন নির্ভর করে।  ফুটপাতের হকার উচ্ছেদ হয়। কিন্ত ফুটপাতে গাড়ী পার্কিং করে রাখতে পারে নির্বিকার ভাবে। দুই লক্ষ প্রাইভেট গাড়ীর জন্য আইন করে ঢাকার প্রতিটি বাড়ীতে, মাকের্টে পার্কিং ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই নগরে শিশু আর হকারদের জন্য নেই পরিকল্পনা আর উদ্যোগ।

বাজেট এদেশের অর্থনৈতিক আইনী দলিল। দেশের লক্ষ কোটি সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত ভ্যাট, ট্যাক্স দিয়ে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে। অপর দিকে কিছু মানুষ ভ্যাট, ট্যাক্স না দিয়ে জমিয়ে নেয় অর্থ। প্রতিবছর বাজেটে কালো টাকাকে বৈধ করার সুযোগ দেয়া হয়, যা বাংলাদেশ সংবিধান পরিপন্থী। বাংলাদেশ সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে,‘‘ রাষ্ট্র এমন অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করিবেন, যেখানে সাধারণ নীতি হিসাবে কোন ব্যক্তি অনুপার্জিত আয় ভোগ করিতে সমর্থ হইবেন না’’। এক শ্রেণীর মানুষের কালো টাকাকে সাদা করার সুযোগের মাধ্যমে বৈষম্য সৃষ্টি করা হচ্ছে।এ অবস্থার অবসান হওয়া জরুরি।

বিদুৎ উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত। বাংলাদেশ সংবিধানের ১৬ অনুচ্ছেদে নগর ও গ্রামের বৈষম্য দূরীকরণ, কৃষি ও শিল্প বিপ্লবের লক্ষ্যে বিদুৎতায়নের কথা বলা হয়েছে। এ দেশের নগর দোকান, বিলবোর্ড, রাস্তায় আলোক সজ্জায় যখন ভরপুর থাকে বা প্রচন্ড শীতল এসিতে যখন নগরে মানুষ আরামে ব্যস্ত। তখন অনেক গ্রামেই কৃষির জন্য নূন্যতম বিদুৎ সরবারহ করা যায় না।

বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে, সংক্রামক রোগ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু মানুষের মাঝে বৃদ্ধি পাচ্ছে অসংক্রামক রোগ। হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত মোটা হওয়ার মতো অসংক্রামক রোগগুলোর বৃদ্ধি দেশের জনস্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কায়িক পরিশ্রম, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাস তামাক ব্যবহারের কারণে এই অসংক্রামক রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ সকল রোগের রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তি পর্যায়ের চিকিৎসা ব্যয় অনেক। কিন্তু ব্যবসায়িক স্বার্থকে প্রাধন্য দিতে গিয়ে ক্ষতিকর পণ্যগুলো নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে অনেক শিথিলতা দেখা যায়।

সম্প্রতি দীর্ঘ ২ বছর পর তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের বিধিমালা পাশ করা হল, যাতে তামাক কোম্পানিগুলোকে তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে ছবিসহ সতর্কবাণী প্রদানে ১২ মাসের সুযোগ দেয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রেও জনস্বাস্থ্যকে প্রাধান্য না দিয়ে তামাক কোম্পানির স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্যকে প্রাধান্য দেয়া হয় না।

সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত উন্নয়নের পূর্বশর্ত।  ঢাকা শহরের অধিকাংশ প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষ হেঁটে, রিকশায়, বাস, সাইকেলে চলাচল করে। রিকশায় চলাচল করে একটি বড় অংশের জনগোষ্ঠী। যানজটের অজুহাতে এ নগরের অনেক রাস্তা হতে রিকশা বন্ধ করা হয়েছে, অথচ গুটি কয়েক মানুষের বাহন প্রাইভেট গাড়ী যে কোন রাস্তায় চলতে পারে। বর্তমানে ঢাকার অধিকাংশ রাস্তায় প্রাইভেট গাড়ীর কারণে যানজট হয়। কিন্ত নগরে প্রাইভেট গাড়ী নিয়ন্ত্রণে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় না।এ নগরে প্রাইভট গাড়ী নিয়ন্ত্রণ করে পাবলিক বাস বৃদ্ধির মাধ্যমে বৈষম্য নিরসন জরুরি।

এ দেশ এগিয়েছে, এ দেশ এগিয়ে যাবে। দেশের অর্থনীতি আরো শক্তিশালী হবে। আমরা স্বপ্ন দেখি দেশের পরিবেশ দূষণ কমে আসবে, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রাধান্য পাবে, দেশের মানুষের কর্মমুখী শিক্ষার জ্ঞান বৃদ্ধি পাবে। আমরা সুখী কল্যাণকর রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করবো। দেশের স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও পরিবেশ উন্নয়ন হবে বৈষম্যহীন।

ছবি: ইন্টারনেট

Monday, June 15, 2015

ধূমপান শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর..... ৩০ সেকেন্ড স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন....

ধূমপান শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর..... ৩০ সেকেন্ড স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন....

Thursday, July 3, 2014

খাদ্যের বিষাক্ততা: বিদ্যমান আইনসমূহ

খাদ্যের বিষাক্ততা: বিদ্যমান আইনসমূহ
সৈয়দ মাহবুবুল আলম, আইনজীবী ও নীতিবিশ্লেষক

খাদ্যে বিষাক্ত দ্রব্যের ব্যবহার বর্তমান সময়ে দেশের জনগনের মাঝে এক আতংকের বিষয়। দ্রুত লাভের স্বার্থে কিছু ব্যবসায়ীরা মাছে ও দুধে ফরমালিন, ফলমূলে কার্বাইডসহ নানান বিষাক্ত কেমিক্যাল, সবজিতে রাসায়নিক কীটনাশক, জিলাপি-চানাচুরে মবিল, বিস্কুট, আইসক্রিম, কোল্ডড্রিংস, জুস, সেমাই, আচার নুডুলস এবং মিষ্টিতে টেক্সটাইল ও লেদার রং, পানিতে ক্যাডমিয়াম, লেড, ইকোলাই, লবণে সাদা বালু, চায়ে করাতকলের গুঁড়া, গুঁড়া মসলায় ভূষি, কাঠ, বালু, ইটের গুঁড়া ও বিষাক্ত গুঁড়া রং ব্যবহার করছে। ফলে  কোনো খাবারই নিরাপদ নয়। এই বিশেষ দিকগুলো চরম উপেক্ষা করায় জনস্বাস্থ্য দিন দিন হুমকির মুখে পড়ছে।

বর্তমান বিশ্বে হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক রোগ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলা অসংক্রামক রোগের কারণে বিশ্বে প্রতিবছর ৩ কোটি ৬০ লক্ষ মানুষ মৃত্যুবরণ করে। দক্ষিণ এশিয়ায় মানুষের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ অসংক্রামক রোগ। এ অঞ্চলে বছরে প্রায় ৭৯ লক্ষ মানুষ অসংক্রামক রোগে মারা যায় । মানুষের মাঝে অসংক্রামক রোগ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ খাদ্যভাস। খাদ্যে ভেজালসহ নানা কারণে বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। খাদ্যে  ভেজাল শুধু বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের জন্যও ক্ষতিকর। গবেষকরা এ অবস্থাকে নীরব গণহত্যা হিসেবে অবহিত করেছেন।

বাংলাদেশ সংবিধান ও জনস্বাস্থ্য:
দেশের সার্বিক সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির জন্য প্রয়োজন একটি সুস্থ্য জাতি। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় বাংলাদেশ সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়ে দিক নির্দেশনা রয়েছে। বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫ (ক) অনুসারে চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব এবং অনুচ্ছেদ ১৮ (১) জনগনের পুষ্টিস্তর উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্যের উন্নতি এবং স্বাস্থ্যহানিকর ভেষজের নিষিদ্ধের কথা বলা হয়েছে।

একজনক মানুষের পরিপূর্ণ শারিরীক ও মানসিক বিকাশের লক্ষ্যে পুষ্টিমান সম্পন্ন খাদ্যের প্রয়োজন। ভেজাল ও বিষাক্ত খাদ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।  জনস্বাস্থ্য রক্ষায় ভেজাল ও বিষাক্ত খাদ্য বন্ধ করা সরকারের সংবিধানিক দায়িত্ব।

খাদ্য নিরাপত্তা ও মান রক্ষায় সরকারের একাধিক প্রতিষ্ঠান, কিন্তু রয়েছে সমন্বয়হীনতা:
খাদ্য নিরাপত্তা ও মান রক্ষায় বাংলাদেশের সরকারের একাধিক সংস্থা দায়িত্ব রয়েছে। সরকারের ৭টি মন্ত্রণালয় নিরাপদ ও মান সম্মত  খাদ্য নিশ্চিতের সাথে সরাসরি জড়িত। এছাড়া বিভিন্ন অধিদপ্তর ও স্থানীয় সরকার অধিদপ্তরগুলোর উপরও বিভিন্ন দায়িত্ব সুপষ্টভাবে নির্দিষ্ট করা রয়েছে। খাদ্য উৎপাদন, মজুদ, বিপনন, বাজারজাতকরণ, মূল্য নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য মান রক্ষার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়, বানিজ্য মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, মৎস ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর, কৃষি অধিদপ্তর, প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর, মৎস অধিদপ্তর,  বিএসটিআই, বিসিএসআইআর এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। এ সংস্থাগুলোর নীতিমালা, আইন ও কার্যপরিধিতে খাদ্য মান রক্ষা সংক্রান্ত সুপষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পুলিশকে বিভিন্ন আইনে অধীন আইন বাস্তবাস্তবায়নে সহযোগিতার বাধ্যকতা রয়েছে। খাদ্যের সাথে এ সকল মন্ত্রণালয়গুলোর সম্পৃক্ততা থাকলেও এ সংস্থাগুলোর একটির সাথে অন্যগুলোর সমন্বয় নেই। এ সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে ভেজাল ও বিষাক্ত খাদ্য ও জীবন রক্ষাকারী ঔষধ লাগামহীনভাবে বিপনন ও বাজারজাতকরণ করা সম্ভব হচ্ছে। More details https://drive.google.com/file/d/0B3TFp2YeMJ5VU1FwZ09ET3hOQ2M/edit?usp=sharing

পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিচ্ছেন ! কিন্তু ব্যবসায়ীরা অনৈতিক ব্যবসায়ীকে ধরিয়ে দিচ্ছে না কেন?


অনৈতিক বানিজ্য না, জনস্বাস্থ্য প্রধান্য পাবে বিষয়টি আজ ‍নিজকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অনৈতিক বানিজ্যের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নিলেই আন্দোলন আর মিথ্যা প্রচারণা শুরু হয়। তারপর সব বন্ধ। একটি বিষয় নিজেকে পরিষ্কার হতে হবে, জনগনের জন্য বানিজ্য। মানুষের জীবনকে হুমকিগ্রস্ত করার জন্য বানিজ্য নয়।


ভেজাল ঔষধে বাজার সয়লাব। ঔষধে ভেজাল এটা কমন সিক্রেট। ভেজাল ঔষধ ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করার দাবি দীর্ঘদিনের। ঔষধ প্রশাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করলো। ঔষধ ব্যবসায়ীরা ধর্মঘটের দিলেন। অভিযোগ উঠল ঔষধ প্রশাসন ঘুষ খাওয়ার জন্য অভিযান পরিচালনা করছে। বন্ধ হলো ভেজাল ঔষধের বিরুদ্ধে কার্যক্রম। জনতা নিশ্চুপ, দলীয় রাজনীতিবিদরা এক সাথে ঘুম....

খাদ্যের যে ফরমালিনসহ যে রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে, তা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, বাড়াচ্ছে রোগ। এটা শুধু দেশীয় নয়, আন্তর্জাতিক সংস্থার গবেষণাও তা বলে। এফবিসিসিআই অনেকদিন বাজারে বাজারে প্রচারণা চালিয়েছে। কিন্তু বর্তমানে অনৈতিক ব্যবসায়ীরা খাদ্যে ভেজালের বিষয়টি পুরো পুরো অস্বীকার করছে। কিন্তু সত্য ও বাস্তবতা কি আমরা সকলেই জানি।

আইন ও নীতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখলাম নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে সরকারের ৭ টি বিভাগের অধীন প্রায় ২৩টি আইন রয়েছে। কিন্তু এ বিভাগগুলো তাদের দায়িত্ব পালণ করছে না। অবশেষে পুলিশ নিজ হতে এগিয়ে এলো। ফরমালিনযুক্ত ফল ধ্বংশ করছে। পুলিশের বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু হয়েছে। তাদের মেশিন ভাল না। আর সহজ আর সস্তা অভিযোগ পুলিশের এ সুযোগে ঘুষ খাচ্ছে।

কেউ ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন করেছে না? মিয়া খাওয়নে ভেজাল করেন কেন? আর ভেজাল বন্ধে কোন এতদিন উদ্যোগ নেননি কেন? কারা ফরমালিন মেশায়, খাদ্যে ভেজাল করে তা ব্যবসায়ীরা ভাল করেই জানেন। তারা কেন নিজ হতে খারাপ ব্যবসায়ীয়দের ধীরয়ে দিচ্ছে না। পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়ে নিজেদের অপরাধ আর অক্ষমতাকে আড়াল করতে পারবে না।

সরকারে কোন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীরা এ সাথে হয়ে আন্দোলন করতে পারেন। যার মানুষের জীবনকে হুমকির সম্মুখীন করছে। তাদের বিরুদ্ধে কেন দাড়াচ্ছে না। আমরা বিশ্বাস করতে চাই এ দেশের নীতিবান ব্যবসায়ীরা অনৈতিক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দাড়াবেন। তাহলে পুলিশ সহজে অপরাধীদের ধরতে পারবে। পুরাতন সস্তা অভিযোগ দিয়ে পার পাওয়া যাবে না। নিজেদের দায়িত্ব নিতে হবে। অধিকাংশ খাদ্য ব্যবসায়ী যদি ভাল হয়, তবে গুটি কয়েক খারাপকে ধরিয়ে দিলেই চলে। যতদিন তা না হবে, ততদিন পুলিশের এ অভিযান বৈধতা পাবেই।

প্রিয় জনতা, হয় অনৈতিক ব্যবসায়ীদের ধরিয়ে দিতে ব্যবসায়ীদের চাপ দিন। নয়তো ভেজাল খাওয়ার জন্য প্রস্তুত হন। নয়তো পুলিশের কার্যক্রমকে সমর্থন দিন। গুড গুড আর দায়িত্বহীন হয়ে থাকার জন্য চুপ থাকলে চলবে না। একটা বিষয়ে সমর্থন দিতে হবেই।

পুলিশের এ পদক্ষেপ বাংলাদেশের নিরাপদ খাদ্য সৃষ্টিতে দীর্ঘমেয়াদে সম্ভাবনার পথ দেখাবে। ধন্যবাদ বাংলাদেশ পুলিশ....

Saturday, February 8, 2014

হুমকির মুখে জনগণের স্বাস্থ্য রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং রাজনীতি

হুমকির মুখে জনগণের স্বাস্থ্য
রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং রাজনীতি

এ কে এম মাকসুদ, শামীমুল ইসলাম শিমুল, এডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম

গবেষণা প্রবন্ধটির উদ্দেশ্যঃ এই গবেষণা প্রবন্ধটি তৈরী ও তা উপস্থাপনের মূল উদ্দেশ্য হলো, যে যে কারণসমূহ বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্যের প্রতি হুমকি সৃষ্টি করছে সুনির্দিষ্টভাবে সেগুলো চিহ্নিত করে তার একটি তালিকা তৈরী করা, বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্যের প্রতি হুমকি সৃষ্টিকারী বিষষমূহ সৃষ্টি হবার কারণসমূহ বর্ণনা করার জন্য সহায়ক সুনির্দিষ্ট গবেষণা তথ্য সন্নিবেশিত করা এবং স্বাস্থ্যের জন্য এসব হুমকি দুর করার উপায় খোঁজার আলোচনার সূত্রপাত করতে সহায়তা করা। 

২. গবেষণা পদ্ধতিঃ এই গবেষণা প্রবন্ধটি তৈরীর জন্য বিভিন্ন সেকেন্ডারী সোর্স (ংবপড়হফধৎু ংড়ঁৎপবং) থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে যেমনঃ সরকারী স্বাস্থ্য প্রতিবেদন, সরকারী/বেসরকারী জরিপ ও গবেষণা প্রতিবেদন, গবেষণা জার্নাল, বাংলাদেশে বাংলা ও ইংরেজীতে প্রকাশিত প্রধানত ৩টি দৈনিক প্রত্রিকার প্রতিবেদন (দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক প্রথম আলো এবং দি ডেইলী ষ্টার)। 

৩. স্বাস্থ্য উন্নয়নে দেশের সাম্প্রতিক অর্জনসমূহঃ বিভিন্ন উন্নয়ন নির্দেশকের নিরিখে বাংলাদেশের দ্রুত উন্নতি ঘটেছে। যেমন ১৯৮০ সালে যেখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধিও হার ছিল শতকরা ৩.৮ ভাগ  তা ২০১১-১২ সালে এসে দাড়িয়েছে ৬.২৩।  ১৯৮৩-৮৪ সালে যেখানে দারিদ্র সীমার নীচে ৬২.৬%  মানুষ ছিল তা ২০১০ সালে কমে দাড়িয়েছে ৩১.৫%।  ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে জনসংখ্যা বাড়ছিল ৩.০% হারে। ঐ সময় প্রতি হাজারে শিশু মৃত্যুর হার ছিল ২৬০ জন এবং প্রতি লাখে মাতৃমৃত্যুর হার ছিল ৩০০০ জন।  এরপর বাংলাদেশে প্রতি লাখে মাতৃমৃত্যুর হার ২০০১ সালে ছিল ৩২২ জন যা আবারও ৯ বছরে ২০১০ সালে কমে এসেছে প্রতি লাখে ১৯৪ জনে।  বর্তমানে এদেশে জনসংখ্যার শতকরা বৃদ্ধির হার ১.৩৭%। এদেশে বর্তমানে মানুষের গড় আয়ু ৬৭.৭ , যা ১৯৭৫ সালে ছিল ৪৬ বছর। ১৯৭৩ সালে শিশু মৃত্যুর হার ছিল হাজারে ১৭৩ জন। ১৯৮৫/৮৬ সময়কালে জন্মের সময় কম ওজন নিয়ে (ঁহফবৎবিরমযঃ) শিশু জন্মের হার ছিল শতকরা ৭২ ভাগ , যা বর্তমানে এসে দাড়িয়েছে শতকরা ৩৬ ভাগে । বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি হাজারে শিশু মৃত্যুর হার কমে এসে দাড়িয়েছে ৫৩ জনে। বর্তমানে শিশু প্রসবের সময় ৩১.৭%-এর ক্ষেত্রে প্রসবকাজে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকে। টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ৮২.৯% শিশুকে সবকটি মারাতœক রোগের টিকাদান করা হয়েছে।  সার্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য উন্নয়নের সাম্প্রতিক অর্জনসমূহ অবশ্যই বিশেষ প্রশংসার দাবী রাখে। 

৪. স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো ও জনবলঃ স্বাধীনতাউত্তর ৪২ বৎসরে এদেশের স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো উন্নয়ন ও স্বাস্থ্য জনবল তৈরিতে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে। দেশে বর্তমানে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ইতিমধ্যে ৪৫৯ টি হাসপাতাল রয়েছে এবং জেলা, বিভাগ ও রাজধানী মিলে আরও ১২৪টি হাসপাতাল রয়েছে এবং এ হাসপাতালগুলোতে সর্বমোট ৪১,৬৫৫টি বেড রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা প্রসারে সরকারের রয়েছে ২১টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল। সব মিলিয়ে সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় ৯২,৯২৭ জন জনবল কর্মরত রয়েছে।  এছাড়াও সরকার সম্প্রতি কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ১২,৯৯১ জন কমিউনিটি হেল্্থ কেয়ার প্রোভাইডার নিয়োগ দিয়েছে। সরকারের পরিকল্পিত ১৮,০০০ কমিউনিটি ক্লিনিকের মধ্যে ১১,৮১৬টি চালু করা হয়েছে।  পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো ও জনবল নিয়োগও বেড়েছে ক্রমাগতভাবে। বর্তমানে মোট রেজিষ্টার্ড চিকিৎসকের শতকরা ৬৮ ভাগ বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত। বেসরকারি উদ্যোগে দেশে গড়ে উঠেছে ২,৯৬৬ টি বেসরকারি রেজিষ্টার্ড হাসপাতাল/ক্লিনিক। যদিও রেজিষ্ট্রেশন বা সরকারি অনুমোদন ছাড়াই চলছে আরও অসংখ্য বেসরকারি  হাসপাতাল/ক্লিনিক। ইতিমধ্যে দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ৫৪টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ১৪টি বেসরকারি ডেন্টাল কলেজ, ৮৩টি বেসরকারি হেল্্থ টেকনোলজি ইন্সটিটিউট। 

৫. স্বাস্থ্য সেবা গ্রহনের পরিস্থিতিঃ স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যূরোর এক গবেষণায় দেখা যায় যে, বিভিন্ন রোগ ও স্বাস্থ্য সমস্যার পরামর্শ ও সেবা নেবার জন্য বাংলাদেশের মানুষদের শতকরা ২৩.৪ ভাগ ওধুধের দোকান বা ফার্মেসিতে যায়, শতকরা ১৯.৭ ভাগ মানুষ পরামর্শ ও ওধুধের জন্য গ্রাম্য ডাক্তারের শরণাপন্ন হন, শতকরা ১৬.২ ভাগ মানুষ ব্যক্তিগতভাবে এমবিবিএস বা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেন, শতকরা ৯.০ ভাগ মানুষ প্রাইভেট ক্লিনিকে যায়। অপরপক্ষে শতকরা ১২.১ ভাগ মানুষ উপজেলা হাসপাতাল, শতকরা ৯.০ ভাগ মানুষ জেলা হাসপাতাল বা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যায় এবং শতকরা ৪.১ ভাগ মানুষ সরকারি কমিউনিটি কিøনিক বা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যায়।  আইসিডিডিআরবি পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায় যে শতকরা ৮৫ ভাগ মানুষ শারীরিক অসুস্থতার কারণে চিকিৎসাসেবা নিতে হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে যায় এবং মাত্র শতকরা ১৫ ভাগ মানুষ শারীরিক অসুস্থতার কারণে চিকিৎসাসেবা নিতে এমবিবিএস ডাক্তারের কাছে যায়।  যদিও বাংলাদেশে গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও রাজধানী পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবাদানের জন্য পর্যাপ্ত হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবাদান কেন্দ্র নির্মিত হয়েছে ও বহু দক্ষ জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কিন্তু এখনও দেশের ৪৩.১% মানুষকে কেন ফার্মেসী ও ডিগ্রীবিহীন ডাক্তারের কাছ থেকে স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধের ব্যবস্থাপত্র নিতে হচ্ছে তা বিবেচনার দাবি রাখে।  

৬. পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তাঃ এখনও এদেশে ৩৬% শিশু বয়সের তুলনায় ওজন কম হয় (ঁহফবৎবিরমযঃ)। এছাড়াও এখনও বাংলাদেশের শতকরা ৪১ ভাগ শিশু ও ৪২ ভাগ ১৫-৪৯ বছর বয়সের বিবাহিত নারীরা রক্তস্বল্পতায় ভুগছে। গবেষণা তথ্যে আরও পাওয়া যায় যে, ১৫-৪৯ বছর বয়সের বিবাহিত নারীদের শতকরা ২৪ ভাগ অপুষ্টিতে (ইগও < ১৮.৫) ভুগছে। উন্নয়নের অনেক নির্দেশকে বাংলাদেশের অগ্রগতি ভাল হলেও দেশে পুষ্টি পরিস্থিতি উন্নয়নে অগ্রগতি হতাশাজনক।  গবেষণায় জানা গিয়েছে যে, ১৯৪৩ সালে যে লক্ষ লক্ষ মানুষ দুর্ভিক্ষে মারা গিয়েছিল তার কারণ কোন অবস্থাতেই দেশে ‘খাদ্যের অভাবে অনাহারে মৃত্যু’ ছিল না বরং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হারানো, মুদ্রাস্ফীতিই ও খাদ্য নিয়ে সীমাহীন অসাধু ব্যবসাই ছিল দুর্ভিক্ষের মূল কারণ। সমসাময়িককালেও চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, রসুন এ সবের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছিল এবং এখনও ঘটছে। এ সবের কারণে একদিকে যেমন দরিদ্র মানুষ প্রয়োজনীয় খাদ্য কেনার ক্ষমতা হারিয়েছে অন্যদিকে পরিবারের সবাইকে ক্ষুধা ও অপুষ্টির শিকার হতে হচ্ছে। টাকার অংকে মানুষের আয় হয়তো বেড়েছে কিন্তু খাদ্য ক্রয়ের ক্ষমতা বেড়েছে কিনা সেটি বড় প্রশ্ন।

৭. দারিদ্র ও স্বাস্থ্যঃ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রামক ও জীবাণুবাহিত রোগ, নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের প্রকোপ ধনী ও শিক্ষিতদের তুলনায় অনেক বেশি।  অন্য এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে যে, ৭ ধরণের স্বাস্থ্য সমস্যা যাকে দারিদ্রের কারণে সৃষ্ট রোগ-ব্যাধি বলে আখ্যায়িত করা হয় যেমনঃ যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, এইচআইভি ও এইডস, মাতৃত্বজনিত স্বাস্থ্য সমস্যা, হাম, শ্বাসতন্ত্রের তীব্র সংক্রমণ ও ডায়রিয়া, যে রোগ-ব্যাধিগুলো সহজেই প্রতিরোধ করা যায়। এগুলো প্রতিরোধ করা গেলে মানব সমাজের রোগ-ব্যাধির বোঝাও দ্রুত কমে যাবে।  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে উপরিউক্ত ৭ ধরণের স্বাস্থ্য সমস্যাই এশিয়া ও আফ্রিকার দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের মৃত্যুর কারণ।  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক এক সময় বলেছিলেন যে, উন্নয়নশীল দরিদ্র দেশগুলোর মানুষেরা পৃথিবীর রোগ-ব্যাধির ৯০% বোঝা বহন করে কিন্তু পৃথিবীতে স্বাস্থ্যের জন্য যে সম্পদ ব্যয় হয় তার মাত্র ১০% তাদের জন্য ব্যবহার হয়।  

৮. স্বাস্থ্য খাতে ধনী-দরিদ্র এবং গ্রাম-শহর বৈষম্যঃ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুহার (প্রতি হাজারে) ধনিক শ্রেণীতে ৪৩ আর দরিদ্র শ্রেণীত ৮৫। ধনিক শ্রেণীর পাঁচ বছরের কম বয়সী ২৬ শতাংশ শিশুর বয়সের তুলনায় উচ্চতা কম। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া শিশুদের মধ্যে এই হার দ্বিগুণের বেশি, ৫৪ শতাংশ। বাংলাদেশে ধনী পরিবারের শিশুমৃত্যুর হার দরিদ্র পরিবারের শিশুদের চেয়ে অনেক কম। প্রসবের সময় দক্ষ ও প্রশিক্ষিত ধাত্রী, স্বাস্থ্যকর্মী বা ডাক্তারের সহায়তা গ্রামের চেয়ে শহরের মায়েরা বেশি পান। নিরাপদ প্রসব এবং প্রসূতি ও নবজাতকের সুস্থতার জন্য গর্ভবতী অবস্থায় চারবার স্বাস্থ্য পরীক্ষার পরামর্শ দেওয়া হয়। বাংলাদেশে দরিদ্র শ্রেণীর মাত্র ৭ শতাংশ গর্ভবতীকে চারবার পরীক্ষা করানো হয়। পক্ষান্তরে ধনিক শ্রেণীর মধ্যে এই হার ৪৭ শতাংশ। একইভাবে মাত্র ৫ শতাংশ দরিদ্র প্রসূতি প্রসবকালে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর সহায়তা পান। আর ধনী প্রসূতিদের ৫১ শতাংশ এই সহায়তা পান।  স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে গ্রামের মানুষ শহরের মানুষের তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে। গ্রামের মাত্র ১৩ শতাংশ মা প্রসবকালে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর সহায়তা পান। শহরে এই হার ৩৭ শতাংশ। চারবার প্রসব-পূর্ব স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে পারেন গ্রামের ১৪ শতাংশ গর্ভবতী। শহরে এই হার ৩৭ শতাংশ। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুহার (প্রতি হাজারে) গ্রামে ৭৬, আর শহরে ৬২। গ্রামের পাঁচ বছরের কম বয়সী ৪৫ শতাংশ শিশুর বয়সের তুলনায় উচ্চতা কম। শহরে জন্ম নেওয়া শিশুদের মধ্যে এই হার ৩৬ শতাংশ। 

৯. চিকিৎসা খরচের বোঝা বহনে দরিদ্র মানুষের অক্ষমতাঃ বাংলাদেশে প্রতি ১০০০ জন মানুষের মধ্যে বিগত ৯০ দিনের অসুস্থ্যতার ইতিহাস নিয়ে হিসাব করলে দেখা যায় যে গড়ে ১৭২ জন মানুষ অসুস্থ্য থাকে (সড়ৎনরফরঃু ৎধঃব)। ঐ গবেষণায় আরও দেখা যায় যে, মানুষ একবার রোগে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ্য হলে গড়ে ৫০০ টাকার বেশি খরচ করতে হয়। তাই হিসাব করে দেখা গিয়েছে যে নি¤œ আয়ের পরিবারগুলোর একবার কেউ অসুস্থ্য হলে তার চিকিৎসা ও ওষুধ খরচ বাবদ পরিবারের মোট আয়ের শতকরা ৪০ ভাগ খরচ হয়ে যায়।  তাই দেখা যাচ্ছে রোগাক্রান্ত হলে একদিকে যেমন একজন আয় করতে পারছে না অন্যদিকে রোগের চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে অর্থাভাবে খাবার, ঘরভাড়া, সন্তানদের শিক্ষা খরচের মত মৌলিক মানবিক প্রয়োজন মেটাতে পারছে না। 

১০. অবহেলিত সরকারি স্বাস্থ্যখাত এবং স্বাস্থ্য নিয়ে ব্যক্তিখাতের বাণিজ্য করার অবাধ সুযোগ সম্প্রসারণঃ সম্প্রতি হেলথ ওয়াচের একটি জরিপে দেখা যায় বাংলাদেশে একজন চিকিৎসক গড়ে প্রতিটি রোগীর পেছনে সময় দেন মাত্র ৫৪ সেকেন্ড।  সরকারি হাসপাতালে মাঝে মধ্যে ডাক্তারের দেখা পেলেও তারা রোগীকে ২/১ মিনিটের বেশি সময় দেয় না। রোগী ও রোগীর স্বজনদের সাথে করেন দুর্ব্যবহার। সেই একই চিকিৎসকের প্রাইভেট চেম্বারে গেলে রোগী ও তার আতœীয়-স্বজনদের মনোযোগ দিয়ে আর আদর করে স্বাস্থ্য সমস্যার কথা শুনে নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেয়ার পাশাপাশি ভালভাবে খোঁজ খবর নেন। ফলে রোগীরা সরকারি হাপতালালের পরিবর্তে ঐ চিকিৎসকদের চেম্বার ও ক্লিনিকেই যেতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।  

২০০৭-০৮ অর্থ বছরে স্বাস্থ্যখাতে মোট বাজেটের ৬.৬% বরাদ্দ ছিল। ২০১১ সাথে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যখাতে মাথাপিছু সর্বনি¤œ ৪৪ ডলার বরাদ্দ দেয়ার সুপারিশ করে। বাংলাদেশে বর্তমানে মাথাপিছু বরাদ্দ ২১ ডলার।  চলতি অর্থ বছরে এ বরাদ্দ না বাড়িয়ে উল্টো কমানো হয়েছে। চলতি বছর এ খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে মোট বাজেটের মাত্র ৪.৯%। সরকারি হাসপাতালগুলোতে লোকবল ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার যন্ত্রপাতির অভাব বা বিকল থাকার কারণে মানুষ বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এ সুযোগে বেসরকারি হাসপাতালগুলো ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে ইচ্ছামাফিক অর্থ আদায় করছে। সরকারী স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে মুমূর্ষু রোগীকে চিকিৎসা দেয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময়ই ডিউটিরত ডাক্তারদের পাওয়া যায় না। আর এ কাজটি কখনো কখনো ওয়ার্ড বয় কিংবা সুইপার দ্বারা করা হয় বলে অভিযোগ আছে।  সরকারি স্বাস্থ্যখাত ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসছে, অপরপক্ষে দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে ব্যক্তিখাতে স্বাস্থ্য বাণিজ্যের সুযোগ সুবিধা ও অবকাঠামো। এর ফলশ্রুতিতে, প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নিশ্চিত করার নীতি বাস্তবায়নের পরিবর্তে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর নীতি-আদর্শের অনুসারী হয়ে স্বাস্থ্য খাতের বাজেট কেটে-ছেটে স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার দ্বায়িত্ব দেয়া হয়েছে তথাকথিত স্বাস্থ্য বানিজ্যের ব্যাক্তিখাতের মুনাফাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর। 

১১. গ্রাম বিমুখ ডাক্তার-নার্স ও গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবাঃ ‘বিশ্ব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০০৪’ শিরোনামে বিশ্বব্যাংকের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ৪২.০২ শতাংশ ডাক্তারই তাদের কর্মস্থলে অনুপুস্থিত থাকেন। আপগ্রেডেড ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার সেন্টারগুলোতে ৭৪% ডাক্তার উপস্থিত থাকেন না।  জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ২০১০ ও ২০১১ সালে সরকার ৪১৩৩ জন অস্থায়ী ভিত্তিতে (অ্যাডহক)চিকিৎসকে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রগুলোতে নিয়োগ দেয়। কিন্তু নিয়োগ পাওয়ার ১ বছরের মাথায় গ্রাম ছেড়ে শহরের হাসপাতালে চলে এসেছেন অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া বেশিরভাগ ডাক্তার। তবে তারা বেতন ভাতা তুলছেন ইউনিয়ন থেকেই।   গ্রামীণ মানুষের স্বাস্থ্য সেবার একমাত্র ভরসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। কিন্তু ঐ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স-এ কখনোই প্রয়োজনীয় চিকিৎসক থাকেন না। তারা আসেন আবার বদলি নিয়ে চলে যান শহরে। যেমন, মনপুরা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্্ের ১২ জন মেডিকেল অফিসারের মধ্যে সেখানে কর্মরত রয়েছে মাত্র ১ জন চিকিৎসক।  এতে ব্যাহত হচ্ছে সরকারী চিকিৎসা সেবা। 

১২. ক্রয়-দূর্নীতি: উচ্চমূল্যে কেনা চিকিৎসা-যন্ত্রপাতি ও ওষুধের অপব্যবহারঃ সরকারি হাসপাতালে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ক্রয়ের নামে বিপুল অর্থ লুটপাট হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ১৩০ টাকা দামের ইনজেকশন ৪৮০ টাকা, ৬২ টাকার ইনজেকশন ২০০ টাকা, ১২ টাকার ট্যাবলেট ২৫ টাকায় কেনা হয়েছে। এমনি করে ২০০৯-২০১০ অর্থ বছরে ১৬ ধরণের ইনজেকশন, ট্যাবলেট, ক্যাপসুল অতিরিক্ত দাম দিয়ে কিনেছে একটি সরকারী মেডিক্যাল কলেজ কর্ত্তৃপক্ষ। এতে সরকারের ক্ষতি হয়েছে ২,১৩,১৬,১০০ টাকা।  বাংলাদেশ মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট সার্ভে ২০০৮ এর ফলাফলে দেখা যায়, সরকারের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা খাত কর্মসূচির আওতায় যত চিকিৎসা যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছিল, তার ৫০ শতাংশ ব্যবহৃত হয়। ১৬ শতাংশ যন্ত্রের মোড়কই খোলা হয়নি। ১৭ শতাংশ নষ্ট। বাকি ১৭ শতাংশ ব্যবহারের উপযোগী হলেও ব্যবহার করা হয় না। 

১৩. ডায়াগনষ্টিক ল্যাব, নার্সিংহোম ও ক্লিনিকগুলোর অবাধ স্বাস্থ্যসেবা বাণিজ্যঃ সরকারি অনুমোদন ছাড়াই ব্যাঙের ছাতার মত যত্রযত্র গড়ে উঠেছে ডায়াগনষ্টিক সেন্টার, প্যাথলজি ব্যবসা। সাইনবোর্ড-সর্বস্ব এ সব প্রতিষ্ঠানে নিয়মনীতির বালাই নেই, হাতুড়ে টেকনিশিয়ান দ্বারাই চালানো হয় যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ রোগ নির্ণয়ের কাজ। মনগড়া রিপোর্ট তৈরির মাধ্যমে নিরীহ মানুষকে প্রতারিত করা হচ্ছে অহরহ। টেষ্টের ফিও ইচ্ছামত নেয়া হচ্ছে, এখানে মানা হয় না স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্ধারিত ফি রাখার বিধান। রোগী রেফারকারী ডাক্তারকে দেয়া হয় মোট ফি এর ৬০-৬৫ শতাংশ।  সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেই হাসপাতালে ৮০ টাকা দিয়ে ইসিজি করার ব্যবস্থা থাকলেও ঐ হাসপাতালেরই ডাক্তার ও টেকনিশিয়ানদের পরামর্শ ও সহযোগিতায় রোগীদের একই টেস্ট হাসপাতাল পার্শ্ববর্তী ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে করিয়ে আনতে হয় ২০০ টাকা খরচ করে।  এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায় যে রোগনির্ণয় কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে চিকিৎসকরা প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে রোগীদের অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়ে থাকেন। 

১৪. অনুমোদনহীন ব্লাড ব্যাংকগুলোর অপতৎপরতা এবং রক্তবাহিত রোগের লাগামহীন বিস্তারঃ বিভিন্ন সংস্থার জরিপ অনুযায়ী দেশে ব্লাডব্যাংকের ৮১%-ই অনুমোদনহীন। নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালনের জন্য একজন রক্তগ্রহিতাকে কমপক্ষে ৫টি রক্তবাহিত ঘাতক রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে নিতে হয়। কিন্তু ৫০% কেন্দ্রে এইসব পরীক্ষা করার কোনো ব্যবস্থা নাই। ফলে ওই কেন্দ্র হতে সরবরাহকৃত রক্ত গ্রহণ সবসময় ঝুঁকিপূর্ণ।  যেখানে দেশে অনেক ব্লাড ব্যাংকই অবৈধভাবেই চলছে সেখানে রক্তের পরিসঞ্চালনে ৫টি প্রাণঘাতি রক্তবাহিত রোগের জীবাণু পরীক্ষা করা যে হয়না এবং তার মনিটরিং করার যে কোন ব্যবস্থা বর্তমানে এদেশে নেই তা সহজেই অনুমেয়।   

১৫. রোগী কেনা-বেচার বাণিজ্যঃ রাজধানী ঢাকায় প্রকাশ্যে চলছে রোগী কেনা-বেচার মত দুখঃজনক ঘটনা। আর এই রোগী কেনা-বেচার সঙ্গে জড়িত দালাল চক্র। আর এসব দালালের সঙ্গে সর্ম্পক রয়েছে বহু নামী-দামি ডাক্তার, হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। দালালদের ভাগ না দিলে রোগী পাওয়া যায় না। আর রোগী না পেলে হাসপাতাল, আসিইউ, ডায়ালাইসিস সেন্টার চলবে কিভাবে। প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে আসিইউতে রোগী দিলে দালালদের রোগী প্রতি ২ থেকে ৩ হাজার টাকা, আইসিইউতে অবস্থানকালে প্রতিদিন ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা, অপারেশন হলে রোগীদের থেকে আদায়কৃত মোট অর্থের ২০%-৩০% ভাগ, শয্যা ভাড়ার ২০%-৩০% সহ আদায়কৃত মোট অর্থের একটি বড় অংশ চলে যায় দালালদের হাতে। অভিযোগ রয়েছে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে রোগীকে আইসিইউ নামক টাকার ফাঁদে যদি একবার ফেলা যায় তবে ভিটেমাটি, গাড়ি-বাড়ি বিক্রি করেও রক্ষা পাওয়া যাবে না।    

১৬. ওঝাঁ-বৈদ-হাতুড়ে ও ভূয়া চিকিৎসকদের দৌরাত্ম ও অজ্ঞ ও দরিদ্র মানুষদের অসহায়ত্বঃ ঝাড়-ফুকের নাম করে চিকিৎসা করতে গিয়ে ওঝাঁ-বৈদ্যেরা প্রায়ই রোগী বিশেষত শিশু-কিশোর-কিশোরীদের ছ্যাঁকা দিয়ে, পুড়িয়ে বা দূর্ঘটনায় ফেলে দিয়ে মারছে। প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোকে এমবিবিএসসহ বিভিন্ন ডিগ্রির পরিচয়ধারী লোকজন এনে অপচিকিৎসা দেয়ায় প্রতারণার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। খোদ রাজধানীতে চলছে হাতুড়ে দন্ত চিকিৎসা। রাস্তার ধারে বসেই প্রয়োজনে একটি প্লায়ার্স দিয়ে টেনে উপড়ে ফেলে রোগীর দাঁত। যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্তকরণের কোন বালাই নেই।  দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এক শ্রেণীর মানুষ বিভিন্ন পদ্ধতির চিকিৎসার কথা বলে দিনের পর দিন অপচিকিৎসা ও প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে। এদের প্রায়ই দেখা যায় ফুটপাত বা রাস্তার ধারে বৃত্তাকার লোকের জটলার (মজমা) মাঝ থেকে মাইকে নানা অঙ্গভঙ্গিতে আকর্ষণীয়ভাবে বিভিন্ন রোগের লক্ষণ ও সর্বরোগ নিরাময়কারী ওষুধের কথা বলে যেতে। তার সামনে হরেক রকমের গাছের বাকল, শিকড়, ফল বা কোন প্রাণির দেহের অংশবিশেষ। অনেকে চিকিৎসায় রোগ সেরে যাবার ১০০% গ্যারান্টি এবং বিফলে পিুরো টাকা ফেরৎ দেবার গ্যারান্টি দেয়। এ ধরণের চটকদার কথাবার্তায় বা বিজ্ঞাপনে সহজ-সরল মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে তাদের ওষুধ কিনতে প্রলুদ্ধ হয়ে অপচিকিৎসার শিকার হন।  এই প্রতারকরা মূলত: স্বাস্থ্য মোটা-তাজা ও সুশ্রী করা, যৌন সমস্যা, হাঁপানি, দাঁতের ব্যথা, অর্শ, গেজ, ভগন্দর, জন্ডিস, এইডস, ক্যান্সার, ডায়াবেটিসের চিকিৎসা করে। স্বল্পমূল্যে সুচিকিৎসার আশ্বাস দিয়ে প্রথমে রোগীদের নিয়ে আসা হয়, এরপর নানা বাহানায় টাকা নিয়ে কাল্পনিক ওষুধ দিয়ে সর্বস্বান্ত করে ছেড়ে দেওয়া হয়। 

১৭. পরিবেশ বিপর্যয় ও স্বাস্থ্য সংকটঃ বাংলাদেশে নদীনালা, খাল-বিল পুকুরসহ জলাশয় দখল ও দুষণের কারণে সুপেয় পানির আধার ধ্বংস হয়ে পানি সংকট বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া জলাশয় দখল ও দুষণের শিকার হওয়ায় পরিবেশ ও জনস্বাস্থের উপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। উপকূলীয় এলাকার খাবার পানিতে মাত্রাতিরিক্ত লবণ থাকায় সেখানকার মানুষ উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি বিকল হওয়া, ডায়রিয়া ইত্যাদি রোগে ভূগতে শুরু করেছে।  ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ৪২০৬ টন বর্জ্য সৃষ্টি হয়। সিটি কর্পোরেশনের ট্রাকগুলো বর্জ্য-এর একটি বড় অংশ অপসারণ করার পরও প্রতিদিন ১৭০০ টন বর্জ্য অপসারণ করা হয় না। এই বর্জ্য পরিবেশ দূষণ করছে যা স্বাস্থ্যের জন্য চরম ক্ষতিকর।  হাজারীবাগের ১৮৫টি চামড়াশিল্প থেকে গড়ে ৭৫ মেট্রিক টন কঠিন বর্জ্য নির্গত হয় এবং নির্গত হয় ২১ হাজার ৬০০ ঘনমিটার তরল বর্জ্য, যা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এসব বর্জ্য পরিশোধনের ব্যবস্থা নেই একটি কারখানাতেও। 
তাই তা ছড়ায় বাতাসে, বুড়িগঙ্গার পানিতে, এমন কি ভূগর্ভের পানিতেও।  ট্যানারি শিল্পের বিষাক্ত রাসায়নিক দূষণে রাজধানীর ২০ লাখ মানুষ চরম ঝূঁকিতে রয়েছে। অসহনীয় এই দূষণে সেখানে দেখা দিয়েছে নানা রোগ। এই শিল্পের সাথে জড়িত ৫০ হাজার শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ৪০ হাজারই এই ভয়াবহ দূষণের নীরব শিকার। দূষণের কারণে শ্রমিকরা ইতিমধ্যেই আক্রান্ত হয়েছে স্কিন ক্যান্সার, যক্ষ্মা, বুকে ব্যথা, জন্ডিস, হাঁপানিসহ নানা জটিল রোগে।  রাজধানীর দেড় হাজারের বেশি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টার চিকিৎসা বর্জ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের ৯২% বর্জ্য রাস্তার উপর খোলা ডাস্টবিনে, নর্দমা বা সরাসরি নদী-খালে ফেলা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ বর্জ্যরে সাথে এসব মেডিক্যাল বর্জ্য মিশে গেলে সংক্রামক ব্যাধি খুব দ্রুত ছড়ায়।  এক ভাইরোলজিষ্ট-এর মতে, পয়োঃনিষ্কাশন লাইনের ভেজা, স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে টাইফয়েড ও আমাশয়ের মতো পানিবাহিত রোগের জীবাণু বহুদিন বেঁচে থাকে এবং অনেক জায়গায় দেখা গেছে পয়োঃনিষ্কাশনের লাইনের দূষিত পানির পাইপ ছিদ্র হয়ে মিশছে ওয়াসার সরবরাহ করা পানির সঙ্গে।   রাজধানীতে আবাসিক এলাকার জন্য শব্দের মাত্রা ৫৫ ডেসিবল নির্দিষ্ট করা হয়েছে। একাধিক জরিপে দেখা গেছে ঢাকা শহরের শব্দ দূষণের মাত্রা ৬০ ডেসিবেল থেকে শুরু করে কোন কোন স্থানে ১০৬ ডেসিবল পর্যন্ত রয়েছে। অতিমাত্রায় শব্দের মধ্যে বসবাস করলে মানুষের হার্ট অ্যাটাক, শ্রবণ প্রতিবন্ধিতা হতে পারে।  

১৮. খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার ও ভেজাল খাদ্যঃ বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল চলছে বিপুল লাভজনক ও অনেকটা বাধাহীনভাবে এবং শাস্তির কোন ভয়-ডর ছাড়াই। অনেক বিক্রেতা বা উৎপাদক এটাকে তারা কোন অপরাধই মনে করছে না। বাচ্চাদের অতি প্রিয় চিপস, চকলেট, আইসক্রিম ও আচারেও দেদারসে মেশানো হয় ক্ষতিকর ও বিষাক্ত রং ও রাসায়নিক পদার্থ। অধিকাংশ হলুদের গুড়ায় মেশানো হয় লেড ক্রোমেট, মেটানিল ইয়েলো যা অতি দ্রুত লিভার ধ্বংস করে। গাড়ির ফেলে দেওয়া মবিল দিয়ে বানানো হচ্ছে “খাঁটি ও ঝাঁঝাঁলো সরিষার তেল”। ভেজাল ও ক্ষতিকারক খাবারের দ্রুত বিপুল পরিমাণে বিক্রি ও আকাশচুম্বি মুনাফা করতে বারবার টিভি ও রেডিও চ্যানেলে দিয়ে চলেছে লোভনীয়, চটকদার অথচ অসত্য বিজ্ঞাপন।      

মাছ-মাংস, শাক-সবজি ও ফলমূলসহ নানা খাবারে ফরমালিন মিশিয়ে এবং সেগুলো বাজারজাত করে বিক্রির মাধ্যমে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীরা মানুষের জীবনকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই ফরমালিন থ্রোট ক্যান্সার, ব্লাড ক্যান্সার, শিশুদের শ্বাসকষ্টজনিত রোগসহ বিভিন্ন চর্মরোগের জন্ম দিতে পারে। ফল পাকানোর জন্য ক্যালসিয়াম কার্বাইড ব্যবহৃত হয়ে থাকে যা কিডনি, লিভার, প্রস্টেট ও ফুসফুসে ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। বাজারে চড়া দামে বিক্রির জন্য কীটনাশক ব্যবহার করে কাঁচা আম দ্রুত পাকিয়ে তা বিক্রি করা হয়।   আনারস বড় হলে তখন তাতে হলুদ রং ধরানোর জন্য কেমিক্যাল প্রয়োগ করা হয় ফলে এসব আনারস খেলে মানুষের ক্যান্সার হতে পারে বা লিভার ও কিডনি নষ্ট হয়ে যেতে পারে।  বেশি লাভের আশায় মৌসুম শুরু হবার আগেই কচি কাঁঠালে নির্বিচারে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে বিষাক্ত ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথ্রায়েল, কপার সালফাইড, পটাসের তরল দ্রবণ, রাইপেন ও ইথিফন জাতীয় বিষাক্ত পদার্থ।   

খাবারের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য বিরিয়ানি, জিলাপি, বেগুনি, পিঁয়াজু, মিষ্টিসহ বিভিন্ন খাবারেও যে রং ব্যবহার করা হয় তার অধিকাংশই মানুষের শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এ রংগুলি লিভার এবং কিডনির ক্ষতি করতে পারে ও বিভিন্ন ধরণের ক্যান্সারের জন্ম দিতে পারে। এছাড়া টারট্রাজিন এবং ইরাইথ্রোসিন নামক রংগুলো মসলা, আখনি, ফলের জুস, মুসুরির ডাল এমনকি তেলকে রঙিন করার জন্য ব্যবহার করা হয় যা ক্যান্সার, চর্মরোগ এবং বিভিন্ন ধরণের শ্বাসকষ্টজনিত রোগের জন্ম দিতে পারে। মিষ্টি জাতীয় খাবার তৈরিতে চিনির পরিবর্তে স্যাকারিন ব্যবহার করা হয় যা শরীরে বিভিন্ন ধরণের ক্যান্সার সৃষ্টির কারণ।  

বর্তমানে মানুষের মৃত্যুর একটি বড় কারণ খাদ্যশষ্যে রাসায়নিক ব্যবহার। কৃষিতে চলছে মাত্রাতিরিক্ত হারে কীটনাশক, সার ও আগাছানাশক রাসায়নিক বিষের ব্যবহার। কৃষিতে এসবের ব্যবহারের ফলে মানুষের মধ্যে বেড়ে চলেছে ক্যান্সার, নিউরোপ্যাথি, কিডনি, লিভার ও হার্ট ডিজিজ। কৃষিতে এসবের ব্যবহারে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অস্বাভাবিকতা, এন্ডোক্রাইন, হরমোন, প্রজনন ও ¯œায়ুতন্ত্র ব্যবস্থার বিপর্যয় ঘটছে।  পোল্ট্রি খামারের মুরগিতে আর খামারের মাছে মাত্রাতিরিক্ত রোগ প্রতিরোধক ওষুধ প্রয়োগ ও পোল্ট্রি-ফিস ফিডের সাথে অতিরিক্ত মাংসবর্ধক ওষুধ-ইনজেকশন প্রয়োগের কুপ্রভাব মানুষের শরীরে কতখানি ও কিভাবে পড়ছে তা এখনো অজানা।

১৯. মোটাতাজাকৃত গরুর মাংস খাওয়াতে স্বাস্থ্য ঝুঁকিঃ এক শ্রেণীর বেপারী মুনাফার লোভে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর মোটা-তাজাকরণের ওষুধ খাইয়ে দেদারসে গরু বিক্রি করে। একজন লিভার বিশেষজ্ঞ বলেন, ষ্ট্রেরয়েড জাতীয় ওষুধ খাইয়ে গরু মোটা-তাজা করা হয়। পাশাপাশি ইউরিয়া ও রাব খাওয়ানো হয়। এ সকল ওষুধ ও কেমিক্যাল প্রয়োগকৃত গরুর মাংস খেলে লিভার নষ্টসহ জটিল রোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, আর্থ্রাইটিস হয়ে হাড় ভেঙ্গে যাওয়া, চোখে ছানি পড়া ও বুদ্ধিজনিত ঘাটতি হওয়ার আশংকা রয়েছে। এছাড়া চেহারা সুন্দর ও নাদুস-নুদুস হবার জন্য এক শ্রেণির তরুণীরা গরু মোটা-তাজাকরণের (ডেকাসন, ওরাডেক্সন, বিকাসন ইত্যাদি) ওষুধ ব্যবহার করে থাকে। ঐ সকল তরুণীদেরও অনুরূপ রোগব্যাধি ও জটিলতা হওয়ার আশংকা রয়েছে।  

২০. ফর্সা হওয়া ও মোটাতাজা হবার জন্য প্রশাধনী-মেডিসিন ও মারাত্মক রোগের ঝুকিঁঃ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণের মতে, বিষাক্ত মার্কারি  সংমিশ্রণে তৈরি ত্বক ফর্সা ক্রিম ব্যবহারে কিডনির ক্ষতি হতে পারে। মায়েরা অস্বাভাবিক শিশুর জন্ম দিতে পারে। তাছাড়া ব্যবহারকারীর স্মৃতিশক্তি লোপ পায়, উদ্বেগ-উৎকন্ঠা বাড়ে, হতাশা বাড়ে। উপরন্ত, গোসল ও হাতমুখ ধোয়া পানি মার্কারিযুক্ত হয়ে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে খাবার পানি ও মাছের মাধ্যমে তা মানবদেহে ঢুকে অনুরূপ রোগ সৃষ্টি করতে পারে।    

২১. মাদক সেবনঃ অনুমান করা হয় যে, সারাদেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৫০ লাখ। এক হিসাবে মাদকাসক্তরা বছরে ৮ হাজার ২১৩ কোটি টাকা ব্যয় করে। হেরোইন, ইয়াবা, আইসপিল, গাঁজা, মদ, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদক অবৈধভাবে বিদেশ থেকে আনা হচ্ছে। এক হিসাবে প্রতি বছর ভারত থেকে ১৬শ’ কোটি টাকার ফেনসিডিল চোরাই হয়ে আসে। এই ব্যবসার সহায়ক হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক প্রভাব বা প্রশ্রয়। এসব মাদকের পুরোটাই আসছে অবৈধভাবে বিদেশ থেকে। আর দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। লাভজনক ব্যবসা হওয়ায় সন্ত্রাসী, ছিনতাইকারী ও স্থানীয় অসাধু রাজনৈতিক নেতা এসব জায়গায় অর্থ লগ্নি করে।  ১৯৯৯ সালের এক হিসাবে দেখা গিয়েছিল যে, এ দেশের মানুষ ব্যক্তিগতভাবে স্বাস্থ্য পরিচর্যার জন্য ৮৫.২ কোটি ডলার খরচ করত কিন্তু একই সময়ে এ দেশের মানুষই ধুমপান করার জন্য বৎসরে ১০৫ কোটি ডলার খরচ করত।  তাই দেখা যাচ্ছে, মানুষ তার অতি প্রয়োজনীয় বিষয় অর্থাৎ স্বাস্থ্যের জন্য যা খরচ করছে, তার চেয়েও অনেক বেশি খরচ করছে স্বাস্থ্যক্ষতির পেছনে। 

২২. পশু-পাখি থেকে মানুষের মাঝে রোগের সংক্রমণঃ প্রতি বছর পশু-পাখি থেকে গড়ে তিনটি নতুন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। প্রভাবশালী স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সাময়িকী দ্য ল্যানসেট এ তথ্য দিয়েছে। এতে বলা হয়, গত ৭২ বছরে মানুষ প্রায় ৪০০ নতুন সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছে। এ সব ব্যাধির ৬০%-এর উৎস পশু বা পাখি। মানুষ আক্রান্ত হবার আগ পর্যন্ত একটি জীবাণু সর্ম্পকেও বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারেননি। ঐ গবেষণা সাময়িকীতে বলা হয় যে, পশু-পাখি থেকে আসা রোগে প্রতি বছর কোটি কোটি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। আর লাখ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে। এর মধ্যে আছে অ্যানথ্রাক্স, টোক্সোপ্লাজমোসিস, ব্রুসেলোসিস, র‌্যাবিস, কিউ ফিবার, চ্যাগাস ডিজিজ, রিফট ভ্যালি ফিভার, সার্স, ইবোলা হেমোরোজিক ফিভার, নেইল ভাইরাস, চিকুনগুনিয়া, এইচআইভি, নিপাহ ভাইরাস, এভিয়ান ইনফ্লুয়েনজা, সোয়াইন ফ্লু প্রভৃতি।  বাংলাদেশ এসব রোগের ঝূকির মধ্যে রয়েছে।

২৩. সড়ক দুর্ঘটনা, অকাল মৃত্যু ও প্রতিবন্ধী মানুষ তৈরীঃ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ৫৫ জন মানুষ মারা যাচ্ছে। সরকারি হিসেব গত ১০ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মারা গেছে ৩৪,৯১৮ জন যা গড়ে বছরে ৩৪৯১ জন। তবে বেসরকারি হিসেবে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় ২০০০০ বেশি মানুষ। দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ১৬ লাখ। আর বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্সের সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ। বাকি ৫ লাখের বেশি চালক অবৈধ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চালকের ভুলের কারণেই বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটে। ভূয়া বা লাইসেন্সবিহীন চালক বা অযোগ্য হয়ে যাওয়া চালক সবাই বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের প্রতি হুমকি ও হাজার হাজার মানুষের অকাল মৃত্যুর কারণ। 

২৪. ভেজাল ও নকল ওষুধের অবাধ বাণিজ্য এবং অসহায়দের অপমৃত্যুঃ সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, নামী দামি কোম্পানির ওষুধ নকল করে দীর্ঘদিন যাবৎ বাজারজাত করে আসছে এক শ্রেণির প্রতিষ্ঠান ও লোকজন।  এছাড়াও দেশে আকাশ ও স্থল পথে বিদেশ থেকে ব্যাপক হারে আসছে জীবন রক্ষাকারী নকল ও ভেজাল ওষুধ। নি¤œমানের এ সব ওষুধ সেবনে মৃত্যুও হার বেড়ে চললেও এই নিয়ে কোন মনিটরিং নেই। এই সকল নি¤œমানের ও ভেজাল ওষুধের মার্কেট গ্রামাঞ্চলে। ঢাকা শিশু হাসপাতালের একজন অধ্যাপক বলে যে, শুধু ১৯৯২ সালে প্যারাসিটামল সিরাপ সেবনে তিন শতাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ধরা পড়ে। তবে এদেশে ভেজাল ও নি¤œমানের ওষুধ কিংবা খাদ্যসামগ্রী খেয়ে কেউ মারা গেলে বিচারের কোন নজির নেই।   

২৫. ভুল ওষুধ প্রয়োগ ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ঃ ১৯৯০ সালে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ভুল ওষুধ সেবন ও ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর ২ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে।  তাহলে প্রশ্ন হলো, ১৫ কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশের মত একটি অনুন্নত দেশে ভেজাল বা ভূলভাবে ওষুধ খাবার কারণে কত মানুষ মারা যাচ্ছে তার হিসেব কি এদেশে আছে? বাস্তব সত্য হলো এ ধরণের কোন পরিসংখ্যান বাংলাদেশে এখনও নাই। ওষুধের কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া বা মৃত্যুর পেছনে কাজ করে মূলত: চিকিৎসক কর্তৃক প্রদত্ত এবং রোগী কর্তৃক গৃহীত ভুল ও ক্ষতিকর ওষুধ। বিশ্ব জুড়েই ওষুধ কোম্পানিগুলো চিকিৎসকদের উৎকোচ বা বিভিন্ন ধরণের সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে অকার্যকর, ক্ষতিকর, অপ্রয়োজনীয় ওষুধের অতিমাত্রায় প্রেসক্রাইব করার জন্য উদ্বুদ্ধ করে। 

২৬. বিষাক্ত রাজনীতি-প্রশাসন ও বিষাক্ত ওষুধঃ কেরানীগঞ্জের কাশেম আহমেদ (ছদ্ম নাম) দীর্ঘদিন যাবৎ জীবন রক্ষাকারী ওষুধ তৈরি করে আসছে আটা, ময়দা ও নানা রকমের ক্যামিকেল দিয়ে। এভাবে বছরের পর বছর দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারী ওষুধ বাজার মিটফোর্ডে নকল, ভূয়া ওষুধ তৈরি ও বিক্রি করতো। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এবং একটি সন্ত্রাসী বাহিনীর ছত্রছায়ায় সে ৫ টাকা দামের ওষুধ বিক্রি করতো ২০ থেকে ১০০ টাকায়। কেমিষ্ট এন্ড ড্রাগিষ্ট সমিতি সূত্রে জানা যায় যে, এর আগে কাশেমকে নকল, ভেজাল ও বিষাক্ত ওষুধ উৎপাদন করে বাজারজাত করায় গ্রেফতার করা হয়েছিল। সে দ্রুত ছাড়া পেয়ে পুনরায় নকল, ভেজাল ও বিষাক্ত ওষুধ প্রকাশ্যে পাইকারী বিক্রি করতে থাকে। এ সব ওষুধ রাজধানীসহ সারাদেশে ওষুধের খুচরা ব্যবসায়ীরা নিয়ে বিক্রি করে থাকে। কাশেমের কোটি কোটি টাকার আয়ের ভাগ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসন ও সন্ত্রাসীরা নিয়মিত পেয়ে থাকে।  

২৭. ওষুধের দাম ও মান নিয়ন্ত্রণে ওষুধ প্রশাসনের অক্ষমতা এবং লাগামহীনভাবে ওষুধের দাম বেড়ে চলা আর দরিদ্র মানুষের ওষুধ কেনার অক্ষমতাঃ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম ক্রমাগত বাড়ছে। ২ টাকা দামের হিষ্টাসিন ট্যাবলেটের দাম ৩ টাকা বাড়িয়ে ৫ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। ২ টাকার রিবোফ্লোবিন বিক্রি হচ্ছে ৫ টাকায়, ২ টাকার রিবোসনের দাম দাঁড়িয়েছে ৫ টাকায়। তিনটি ক্ষেত্রেই মূল্যবৃদ্ধি ১৫০ শতাংশ। ১৯৮২ সালের ওষুধনীতি প্রনয়ণের পর বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর করালগ্রাস থেকে মুক্ত হয়েছিল দেশের ওষুধবাজার। কিন্তু বিগত দুই দশকে দেশীয় ওষুধ কোম্পানিগুলো বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর চরিত্র ধারণ করেছে।   

ওষুধ প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বাজারে জেনেরিক নামের ২২০০ ওষুধ রয়েছে। এগুলোই বিভিন্ন কর্মাশিয়াল নামে (ব্রান্ড নামে) বাজারজাত হচ্ছে, যার সংখ্যা প্রায় ৪৫ হাজার। অথচ ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর মাত্র ২০৯টি জেনেরিক নামের ওষুধের (কর্মাশিয়াল বা ব্রান্ড নামে প্রায় ৫ হাজার) মান ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। অন্যদিকে জেনেরিক নামের বাকি ১৯৯১টি অর্থাৎ কমার্শিয়াল নামের প্রায় ৪০ হাজার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি প্রজ্ঞাপনের কারণে বিভিন্ন কোম্পানির বাজারজাত করা প্রায় ৪০ হাজার ওষুধের মূল্য ও মান নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না ‘ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর’। এ আদেশের ফলে ওষুধের মান ও মূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে চলে যাওয়ায় তারা ইচ্ছেমত ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করছে। ১৮ বছর যাবৎ কোম্পানিকেন্দ্রিক সিন্ডিকেট নিন্মমানের ওষুধ বাজারজাত করে শত শত কোটি টাকা কামিযে নিচ্ছে।  অন্যদিকে ভেজাল ও নি¤œমানের হোমিওপ্যাথিক ওষুধে বর্তমানে দেশের হোমিও বাজার সয়লাব। ঐ হোমিও ওষুধ আমদানি, উৎপাদন ও বাজারজাতকণের কোন নীতিমালা না থাকায় পরিস্থিতি অধিককতরও জটিলরূপ ধারণ করেছে।   

দেশে উৎপাদিত ও বাজারজাতকৃত ওষুধগুলোর গুণগত মান জানার জন্য দেশে আছে মাত্র দুটি পরীক্ষাগার। প্রতিষ্ঠান দুটিতে কাজ করছেন ৫৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। ওষুধ প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ওষুধ প্রশাসনে ৭৪৫ জন লোকবলের প্রয়োজন; কিন্তু আছে মাত্র ১২২ জন। প্রশাসন সূত্র বলছে, দেশের ৬৪টি জেলায় একজন করে ওষুধ তত্ত্বাবধায়ক (ড্রাগ সুপার) প্রয়োজন কিন্তুু আছে মাত্র ২৯ জন। সারা দেশে এ্যালোপেথিক, হোমিওপ্যাথিক, ইউনানী, আয়ুর্বেদিক, ভেষজ এ সব মিলে দেশে ৮০০ ওষুধ কারখানা আছে আর ওধুধের দোকান আছে প্রায় ৩ লাখ-এর মত। তাই এই বিস্তৃত এলাকা ও ইউনিটসমূহ কিভাবে এত কম জনবল তদারক  করবেন। ওষুধ প্রশাসনের অবকাঠামোগত সমস্যা ও জনবল স্বল্পতার কারণে বাজারে নকল, ভেজাল ও নি¤œমানের ওষুধ ছেয়ে যাচ্ছে। ওষুধ প্রশাসন পরিদপ্তরের পরিচালকের মতে, দেশ থেকে ৭০-৭১টি দেশে বর্তমানে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনবল না থাকলে এই বাজার বাড়ানো সম্ভব হবেনা। 

২৮. ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের বাণিজ্য এবং ওষুধের মাত্রাতিরিক্ত ও অযৌক্তিক ব্যবহার বৃদ্ধিঃ সম্প্রতি হেল্্থ ওয়াচের একটি জরিপে দেখা যায় যে, বাংলাদেশে ২০১০ সালে মোট ৬০০০ কোটি টাকার ওষুধ বিক্রি হয়েছে। তবে এক ওষুধ বিশেষজ্ঞের মতে, এর অর্ধেকটাই অর্থাৎ ৩০০০ কোটি টাকার ওষুধ অতিরিক্ত বা অপ্রয়োজনীয়। তবে ১৯৯৪ সাল থেকে ২০১০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ওষুধ বিক্রির পরিমান বেড়েছে চার গুণেরও বেশি। ওষুধ বিক্রি হলে কোম্পানির লাভ, চিকিৎসকদের লাভ। তাই ওষুধ বিক্রি না বাড়ার কোনই কারণ নেই।  তবে এ সময়কালে মানুষের রোগ ৪ গুন বেড়েছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন আছে? ওষুধ কোম্পানিগুলো নিজেদের পণ্য বিক্রির জন্য তাদের বিক্রয় প্রতিনিধিদের ওপর প্রচন্ড চাপ দেয়। নিজেদের ওষুধ ব্যবস্থাপত্রে লেখানোর জন্য দেশের প্রায় ২০ হাজার প্রতিনিধি চিকিৎসকদের নানাভাবে প্রলুদ্ধ করেন, পুরস্কৃত করেন। তারা এখন সারা দেশের পল্লী চিকিৎসকদেরও এ কাজে ব্যবহার করছে। এ সব কারণে ডাক্তারগণ রোগীদের ব্যবস্থাপত্রে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ওষুধ লিখছেন।  আইন অনুযায়ী কোন ফার্মেসি বা ওষুধের দোকান বৈধ ড্রাগ লাইসেন্স ছাড়া পরিচালনার সুযোগ নেই। দেশে মোট ইস্যুকৃত ড্রাগ লাইসেন্সের সংখ্যা ৯৮ হাজার। তবে বাস্তবে দেশে রয়েছে ৩ লাখের বেশী ফার্মেসি বা ওষুধের দোকান। এ রকম দোকানদাররা আর পাশ না করা ডাক্তাররাও জড়িয়ে গিয়েছে চিকিৎসাসহ ওষুধ ব্যবসার সিন্ডিকেটের সাথে ও মুনাফার লোভের সাথে। তাই এদের নিয়ন্ত্রণ করাও সরকারের জন্য দুরুহ কাজ। যদি এদরকে আইনী কাঠামোর মধ্যে না আনা যায় তাহলে ওষুধের বিশেষত: এ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছা ব্যবহার এবং ভেজাল ওষুধের বাজারজাতকরণ কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। অনেক ভালো ওষুধ কোম্পানি ওই সিন্ডিকেটের ঘুষ প্রদানের প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে পথে বসে গেছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সৎ ওষুধ উৎপাদক, ক্রেতা কারো পক্ষেই ঐ সিন্ডিকেট ভাঙ্গা সম্ভবনা।  

২৯. অত্যাবশকীয় ঔষধের সরবরাহ এবং দারিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঃ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ। জনগণের স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হলে সরকারকে অবশ্যই অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। যদিও বাংলাদেশে এখন বাজারে ৪০০০০-এরও বেশি ওষুধ রয়েছে কিন্তু বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে মাত্র ২২০টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ দিয়েই একটি দেশের প্রায় সমস্ত রোগ-ব্যাধির চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব। তবে এটি অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এই যে ঐ ২২০টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধই প্রয়োজনের সময় এই পৃথিবীর ৩০% মানুষ পায় না বা জরুরি প্রয়োজনে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবাও নেবার ক্ষমতা রাখে না।  

৩০. প্রয়োজনীয় ওষুধ আবিস্কার ও উৎপাদনে আগ্রহ কম এবং অপ্রয়োজনীয় লাভজনক ওষুধের উৎপাদনে ও স্বাস্থ্য অবকাঠামো নির্মানে উৎসাহঃ দেশে ওষুধ উৎপাদনের প্রধান লক্ষ্য এখন জনগনের চিকিৎসার প্রয়োজনে নয়, ওষুধ উৎপাদিত হয় ব্যবসায়িক স্বার্থে, মুনাফা অর্জনের জন্য। অথচ পরিকল্পিতভাবে উৎপাদিত সামান্য ওষুধ এ গরীব জনগণকে অহেতুক যন্ত্রণা ও অর্থহীন মৃত্যুর হাত থেকে মুক্তি দিতে পারত।  বাংলাদেশে উৎপাদিত মোট ওষুধ উৎপাদনের একটি বড় অংশ হলো ভিটামিন, আয়রন টনিক, কাশি/ঠান্ডার ওষুধ, টনিক বলবর্ধক ও মোটা হওয়ার ওষুধ, এনজাইম ও হজমীকারক, এন্টাসিড ও মানসিক রোগের ওষুধ। অথচ এন্টিবায়োটিক, পরজীবী ও কৃমি-বিধ্বংশী ওষুধ, বিবিধ চর্মরোগ ইত্যাদির উৎপাদন অনেক কম, যদিও এগুলো এদেশের মানুষের জন্য অধিক প্রয়োজন।  দরিদ্রদের প্রয়োজনীয় অথচ লাভ কম হয় এমন ওষুধ গবেষণা করে বের করতে বা উৎপাদনে দেশের ওষুধ কোম্পানীগুলোর তেমন কোন উৎসাহ চোখে পড়ে না। অপরদিকে দরিদ্র দেশগুলোর সরকার ও বেসরকারী স্বাস্থ্যখাত মৌলিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দিকে গুরুত্ব না দিয়ে ব্যয়বহুল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ক্রয়, দামী অথচ অপ্রয়োজনীয় কিন্তু লাভজনক ওষুধ উৎপাদনে বেশি আগ্রহী। 

৩১. দালাল চক্র কর্তৃক হাসপাতালে সন্ত্রাস, শোষণ ও ভুয়া চিকিৎসাঃ সাম্প্রতিক এক পত্রিকা প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, এসএসসিও পাশ করনি এমন এক দাগী অপরাধী পঙ্গু হাসপাতালের দালালদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলে ও রোগী ভাগিয়ে নেয়া বাণিজ্যের পাশাপাশি আগারগাও এলাকায়ই পঙ্গু হাসপাতালের অর্থপেডিক্্েরর অধ্যাপক নাম ধারণ করে স্থানীয় এক ক্লিনিকে নিজেই চালিয়ে যাচ্ছিল প্রাইভেট প্রাকটিস ও অপারেশন। কত শত রোগীকে যে সে অপারেশন করেছে তার হিসাব নাই। এর পাশাপাশি সে গড়ে তোলে দালালদের একটি শক্তিশালী চক্র। দালাল চক্রকে ৬০% কমিশন দিয়ে থাকেন ঐ ভূয়া অধ্যাপক।  স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদেরও দিতেন প্রতিমাসে মোটা অংকের চাঁদা যারা ছিল তার নেপথ্য ক্ষমতার উৎস। হাসপাতাল কর্ত্তৃপক্ষ জীবন রক্ষার্থে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করাত।    

৩২. চিকিৎসায় অবহেলাঃ একটি ক্লিনিকে এক অপারেশনের সময় এক রোগীর কিডনিটাই কেটে ফেলেন এক ডাক্তার। রোগীর স্বজনদের দাবি, ঐ ক্লিনিক কর্ত্তৃপক্ষ ওই চিকিৎসকের যোগসাজসে হয়তো কিডনি বিক্রি করে দিয়েছে।  বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, অনেক ডাক্তারই রোগীর অপারেশণ করার বদলে ভুলে তার কিডনিটি কেটে ফেলেন। এ ছাড়া হাসপাতালে মেয়াদউত্তীর্ণ স্যালাইনের কারণে একই রাতে কয়েকজন রোগীর মৃত্যু, ডাক্তারদের ভুল চিকিৎসায় চোখ হারানো এসব খবর পত্রিকায় প্রায়ই বের হচ্ছে। চিকিৎসা অবহেলার কারণে ক্ষতি বা মৃত্যু হলে কি ক্ষতিপুরন বা শাস্তি হবে তা নিয়ে বাংলাদেশে সরাসরি কোন আইন নাই।    

৩৩. অহেতুক অস্ত্রোপচার ও জবরদস্তিমূলক স্বাস্থ্যসেবা-অমানবিক বাণিজ্যের এক আগ্রাসী রূপঃ সম্প্রতি প্রকাশিত জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপে বলা হয়েছে, ১০০টি প্রসবে ১৭টি হচ্ছে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে। কিন্তু দাকোপ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে এই হাসপাতালে স্বাভাবিক প্রসব হয় ৮৮টি এবং অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্রসব হয় ৯০টি। অভিযোগ উঠেছে, সিজারিয়ান অপারেশন ক্ষেত্রে অতিরিক্ত টাকা আয়ের কারণেই এসব অস্ত্রোপচার করা হয়েছে।  অন্য এক প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, হাসপাতাল কর্ত্তৃপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী বিল পরিশোধ করতে না পারায় হাসপাতালেই শিশুর লাশ ফেলে চলে গেছেন কৃষক পিতা।   

৩৪. কিডনি ক্রয়-বিক্রয় বাণিজ্য - মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবসায়ীদের লালসাঃ জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার অন্তত ২০ গ্রামের দুই শতাধিক অভাবি মানুষ দালাল চক্রের ফাঁদে পা দিয়ে তাদের কিডনি বিক্রি করেন। রাঘবপুর গ্রামের দরিদ্র আলতাফ বলেন, “অভাব ঘোঁচাতে মাত্র দেড় লাখ টাকায় কিডনি বিক্রি করেছিলাম।”  মেহেদী, তার কলিজার (লিভার) একটি অংশ বিক্রি করে তার দারিদ্র ঘোঁচাতে চেয়েছিল। মেহেদিকে এই বলে ডাক্তাররা নিশ্চয়তা দিয়েছিল যে তার কলিজার যে অংশটুকু বিক্রির জন্য কেটে নেয়া হবে তা আবার ৩-৪ মাসের মধ্যেই গজিয়ে যাবে। মেহেদী তার কলিজার একটি টুকরা ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে।  

৩৫. প্রবীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সমস্যা ও চিকিৎসাঃ দেশে বাড়ছে প্রবীণদের সংখ্যা। বাংলাদেশে ৬০ বছর বা এর বেশি বয়সের মানুষ এখন এক কোটির বেশি, যা মোট জনসংখ্যার ৭ শতাংশ। এক হিসাব মতে ২০৩০ ও ২০৫০ সালে প্রবীণদের সংখ্যা হবে মোট জনসংখ্যার যথাক্রমে শতকরা ১২ ও ২২ ভাগ। প্রবীণদের স্বাস্থ্য ভঙ্গুর। তবে প্রবীণদের সংখ্যা বাড়লেও তাদের চিকিৎসাসেবার পৃথক ব্যবস্থা দেশের সরকারি বা বেসরকারি কোন হাসপাতালে নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ব্যাপারে এখনই উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে সংকট তৈরি হতে পারে। উপরন্তু, বাংলাদেশে বার্ধক্যজনিত রোগ চিকিৎসা ও সেবা যতেœর জন্য প্রশিক্ষিত জনবলেরও অভাব রয়েছে। 

৩৬. বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি বাণিজ্যঃ এক বছরে ভর্তি ফি বাবদ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা নিয়েছে দেশের ৫২টি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ। ফি নির্ধারিত না থাকায় ইচ্ছামত টাকা আদায় করছে কলেজগুলো। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন যে, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কারণে ফি নির্ধারণ করা যাচ্ছে না। বেসরকারি কলেজগুলোতে ভর্তি ফি সরকারি কলেজগুলোর চেয়ে গড়ে ১২৫ গুণ বেশি। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে এ বছর ভর্তি ফি ছিল ১০ হাজার টাকা মাত্র আর অধিকাংশ বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে নেওয়া হচ্ছে ১৩ লাখ টাকা উপর।  রাস্তার পাশে গজিয়ে ওঠা কোচিং সেন্টারের মত একটি মাত্র বিল্ডিং-এর কয়েকটি কক্ষে প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ খুলে ডাক্তার হবার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ ছাড়াই দ্রুতহারে যে ডাক্তারি ডিগ্রি দেওয়া হচ্ছে সেই ডাক্তারদের চিকিৎসাদানের মান কি তা নিয়ে প্রশ্ন করাটা জরুরি এবং কে ও কিভাবে এই ডাক্তারদের যোগ্যতার পরিমাপ মনিটরিং করছে তা জানা জনগণের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য অধিকতরও জরুরি।  

৩৭. অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় বনাম বঞ্চিত স্বাস্থ্য খাতঃ ১৯৭২-৭৩ থেকে ১৯৯৯-২০০০ সাল সময়কালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ মোট বাজেটের শতকরা হার বিবেচনায় প্রায় অপরিবর্তিত ছিল (প্রায় ৫%) কিন্তু এসময়কালে সামরিক খাতে বাজেট বরাদ্দ বেড়েছিল প্রায় দ্বিগুণ (৯.৫% থেকে ১৭.৫% হয়েছিল)।  সামরিক খাতে ব্যয় কমিয়ে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ালে দেশ দ্রুত উন্নতি করতে পারত। ১৯৯৬-২০০১  সময়কালে সে সময়কার সরকার ১০০০ কোট টাকা দিয়ে (১৭৮ মিলিয়ন ডলার) রাশিয়া থেকে ৮টি মিগ যুদ্ধবিমান কিনেছিল আর ৫৫০ কোটি টাকা (১০০ মিলিয়ন ডলার) দিয়ে কোরিয়া থেকে ১ টি ফ্রিগেড কিনেছিল। এক গবেষণায় দেখা যায় যে, ঐ সরকার যদি ঐ পরিমান টাকা দিয়ে যুদ্ধাস্ত্র না কিনে সেই টাকা দেশের সামাজিক উন্নয়ন খাতে (স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি ইত্যাদি) ব্যয় করত তাহলে বাংলাদেশ থেকে যক্ষ্মা ও কুষ্ঠ নির্মূল করা যেত, মাতৃমৃত্যুর হার কমানো যেত (হাজারে ৪.৩৩ জন থেকে ১.৫ জনে), শিশু মৃত্যুর হার কমানো যেত (হাজারে ৫৭ থেকে ৩৫-এ), ২০ বছরের জন্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৫,০০০ জন শিক্ষকের নিয়োগ দেয়া যেত। 

৩৮. স্বাস্থ্য খাতের সুশাসনঃ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের কেন্দ্রীভূত প্রশাসন ব্যবস্থা স্বাস্থ্য বিষয়ক স্থানীয় চাহিদাগুলো বুঝে এবং স্বাস্থ্য পরিস্থিতির উন্নয়নে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেনি। কেন্দ্রীভূত স্বাস্থ্য প্রশাসন ব্যবস্থার পরিবর্তে বিকেন্দ্রিকৃত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হলে তা স্থানীয় মানুষের চাহিদা এবং স্থানীয় সম্পদের বিবেচনায় স্বাস্থ্য পরিকল্পনা করা সহজ হতো। 

৩৯. প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নয়নে অবহেলাঃ মূলধারার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আজ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না হয়ে অনেকটাই ডাক্তার-হাসপাতাল-ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টার কেন্দ্রিক শহুরে এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। যে ব্যবস্থাটি দেশের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ বিশেষত: ৫০ ভাগ দরিদ্র মানুষের জন্য মোটেই সহায়ক ও সহনীয় নয়। আজ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে যে, অনেক বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের কেবিনগুলো পাচঁতারকা হোটেলের বিলাসবহুল ব্যবস্থাকেও হার মানায় অথচ দেশের ৫০ ভাগেরও বেশি মানুষকে জরুরি প্রয়োজনেও সামান্য ও সাধারণ চিকিৎসার খরচ বহন করতে হিমসিম খেতে হয়। বিশ্বনন্দিত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডেভিজ ওয়ারনারের মতে চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান বা মেডিক্যাল এস্টাবলিশমেন্ট হচ্ছে জনস্বাস্থের জন্য একটি বড় বাধা।

তুলনামূলকভাবে দরিদ্র রাজ্য হওয়া সত্বেও ঔষধ ব্যবহারের বদলে মূলত মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, শিক্ষার প্রসার ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যবিধির উপর জোর দেওয়ায় সাধারণ অসুখে এই রাজ্যে মৃতের হার অনেক হ্রাস পায়। প্রতি হাজারে উত্তর প্রদেশে যেখানে শিশু মৃত্যুর হার ৬৭, সেখানে কেরালায় তা মাত্র ১২ (২০০৮ সালের পরিসংখ্যান মোতাবেক) এবং প্রতি লাখে উত্তর প্রদেশে যেখানে মাতৃ মৃত্যুর হার ৪৪০, সেখানে কেরালায় তা মাত্র ৯৫।  কাজেই শুধু রোগ হলে ওষুধ খেয়ে রোগ সারানোর চিন্তা না করে বরং রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য শিক্ষার প্রসার, নিরাপদ পানি ও স্যানিটারি ল্যাট্রিন ব্যবহারের হার বাড়িয়ে রোগের হাত থেকে বাঁচা যায়। রোগ হলে ওষুধ খেলেই রোগীর রোগ মুক্তি হবে না বরং ওষুধ সেবনে রয়েছে মারাতœক ঝূঁকি। উন্নত বিশ্বে ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় মৃত্যুর হার ৪র্থ স্থানে রয়েছে। অর্থাৎ হার্ট এ্যাটাক, ক্যান্সার ও স্ট্রোক এর কারণে মৃত্যুহারের পরই এর অবস্থান।    

ইতিহাস থেকেই বলা যায় যে, বাংলাদেশেও যদি বেশকিছু রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা (টিকাদান, স্বাস্থ্য শিক্ষা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন, হাত ধোয়ার আচরণ পরিবর্তন, বর্জ্যর ব্যবস্থাপনা, পুষ্টিকর খাদ্য খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা)  সময়মত না নেওয়া হতো তাহলে লাখ লাখ মৃত্যু পথযাত্রী শিশুকে রোগ হবার পর রোগ সারানোর জন্য চিকিৎসাসেবা দেওয়া দেশের সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল একত্রে মিলেও সম্ভব হতোনা। সেইসাথে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাসমূহ কমিয়ে দিয়েছে রোগ হবার পর চিকিৎসার জন্য যে ডাক্তারের ফি, ওষুধ ক্রয়, ডায়াগষ্টিক টেস্ট, হাসপাতালের সিট ভাড়া, খাবার, যাতায়াত ইত্যাদি খরচ। রোগ প্রতিরোধের জন্য কার্যকর ব্যবস্থাসমূহ কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে হাসপাতাল নির্মাণের চেয়েও বেশি ফলদায়ক অর্থাৎ রোগ না হলে তো আর কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ওষুধক্রয়, বিশাল বিশাল হাসপাতাল নির্মাণ, শত শত ল্যাব এবং জনে জনে রোগ সারানোর বিরাট খরচের বোঝা বহন করতে হবেনা। 

৪০. “স্বাস্থ্য” - কি মানবাধিকার না একটি বাণিজ্যিক পণ্য? বাংলাদেশের সংবিধানে স্বাস্থ্যসেবা মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃত, মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত নয়। তবে প্রশ্ন হলো স্বাস্থ্য সেবা দেবার জন্য রাষ্ট্রের যে দ্বায়িত্ব তা সে কিভাবে পালন করবে? এই দ্বায়িত্ব রাষ্ট্র নিজের উপর না নিয়ে ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যবানিজ্যকারী মুনাফাকারী প্রতিষ্ঠান ও বাজার ব্যবস্থার উপর ন্যাস্ত করছে। স্বাস্থ্যসেবা বিক্রি করে অবাধ মুনাফা লোটার দ্বায়িত্ব ও সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক, ওষুধ কোম্পানি, এনজিওদের হাতে। নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাটা নাগরিকের অধিকার হিসেবে না দেখে সেটা বাজার ব্যবস্থার মাধ্যমে নিছক একটি পণ্য হিসেবে জনগণের কাছে বিক্রির চেষ্টা চলছে। প্রশ্ন হলো, যারা এই স্বাস্থ্যসেবা কিনতে পারছে না তাদের জন্য রাষ্ট্র কি করবে?

সারা পৃথিবীতে দেশ হিসেবে আমেরিকায় জনগণের স্বাস্থ্যসেবায় সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়। যার পরিমান প্রতিবছর জনপ্রতি ৭০০০ ডলার। আর কিউবা খরচ করে প্রতিবছর জনপ্রতি ২৫১ ডলার। আমেরিকা সরকারের স্বাস্থ্য খরচ কিউবা সরকারের চেয়ে ২৮ গুণ বেশি হওয়ার প্রেক্ষিতে মানুষের প্রত্যাশিত আয়ু বেশি হবার কথা। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভূত বিষয় হলো উভয় দেশের আয়ু প্রায় সমান। কিউবাতে ৭৭.৬ এবং আমেরিকাতে ৭৭.৫। কিউবাতে শিশু মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৬.২ জন অথচ আমেরিকায় ৬.৮ জন।  স্বাস্থ্যখাতের ব্যয়ে এই বিশাল বৈষম্য সত্বেও স্বাস্থ্য উন্নয়ন সূচকে আমেরিকা ও কিউবার তেমন কোন পার্থক্যই নেই কেন তার কারণ জানা জরুরি। ২৮ ভাগের এক ভাগ খরচ করেই যদি কোন দেশ তার স্বাস্থ্য পরিস্থিতি আমেরিকার মত ভাল করতে পারে তাহলে স্বাস্থ্যের পেছনে ২৮ গুণ বেশি খরচ করে কি লাভ? অবশ্যই লাভ রয়েছে তবে সে লাভ রাষ্ট্রের জনগণের নয় বরং রাষ্ট্র পরিচালনাকারী ধনিক গোষ্ঠীর, স্বাস্থ্য ব্যবসায়ীদের। আর উপরোক্ত পার্থক্যের আরও একটি কারণ হলো আমেরিকায় “স্বাস্থ্য” হলো একটি লাভজনক পণ্য, বাজার যাকে নিয়ন্ত্রণ করে। অপরপক্ষে কিউবাতে “স্বাস্থ্য” হলো একটি অলংঘনীয় মানবাধিকার এবং এই অধিকার রাষ্ট্র তার স্বাস্থ্য কর্মসূচি বিশেষত প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য কর্মসূচীর মাধ্যমে নিশ্চিত করে। তাই আজ আমাদের স্থির করা প্রয়োজন স্বাস্থ্যকে আমরা কী হিসেবে চিহ্নিত করবো। মানবাধিকার না বাণিজ্যিক পণ্য। স্বাস্থ্যকে বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হলে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা একটি শিল্পে পরিণত হবে। ফলে দিন দিন রোগাক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে আর এ খাতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে অর্থ বিনিয়োগ ও মুনাফা বাড়তে থাকবে। 

৪১. উপসংহারঃ এখন ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে ছোট খাট স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়েও নামকরা হাসপাতালের বিখ্যাত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া, ব্যয়বহুল ডায়াগনস্টিক টেস্ট করানো, বিদেশি দামি ওষুধ সেবন করার এক ব্যয়বহুল ও বিলাসবহুল স্বাস্থ্য সংস্কৃতির চালু হয়েছে। অনেকেই ভূলে গেছে যে পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাবার খেয়ে, নিরাপদ পানি পান করে, নিরাপদ পয়ঃনিষ্কাষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করে, নিয়মিত ব্যায়াম করে, স্বাস্থ্য শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্বাস্থ্যকে সুন্দর ও নিরোগ রাখা যায়। এর বদলে আজকে সবাই ভাবছে স্বাস্থ্যকে সুন্দর রাখতে হলে অবশ্যই স্বাস্থকে ব্যয়বহুল ও বিলাসবহুল হাসপাতাল-ক্লিনিকে চিকিৎসা করিয়ে, শরীরের নানা জটিল প্রযুক্তিনির্ভর দামি দামি মেডিক্যাল টেষ্ট করিয়ে, নিয়মিত দামি দামি ওষুধ খেয়ে সুস্থ্য রাখতে হবে। যার ফলশ্রুতিতে, বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় ধনী-দরিদ্র সকল মানুষের স্বাস্থ্যে বাসা বেধেছে নানা অসুস্থতা ও রোগ-শোক। এই ভগ্নস্বাস্থ্যই পরবর্তীতে পরিণত হয় স্বাস্থ্য বাণিজ্যের এক বিশাল শিল্পে। এ স্বাস্থ্য শিল্পকে ঘিরেই ডাক্তার, ক্লিনিক-হাসপাতাল ব্যবসায়ী, ওষুধ কোম্পানির মালিক, ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের মালিক সবাই মিলে গড়ে তুলেছে এক বিশাল বাণিজ্য সাম্রাজ্য। 

দেশের স্বাস্থ্যখাতে কত ব্যয় হবে এবং এই খাত কিভাবে চলবে তা ঠিক করে ক্ষমতাশীন রাজনৈতিক দল। ক্ষমতায় আসার আগেই ঐ দল বলে দেয় যে, আগামী ৫ বছরে সেই দল স্বাস্থ্যখাত নিয়ে কি কি করবে। ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য বিভাগ ক্ষমতাসীন সরকারের নির্দেশনায় তাদের রূপকল্প বাস্তবায়নে এগিয়ে চলে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে দেশের ‘স্বাস্থ্য‘ হলো একটি রাজনৈতিক বিষয় - যার রোডম্যাপ ঠিক করেন রাজনীতিবিদগণ। তাই সরকারী ও বিরোধী দল সবাই তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচীতে জনগনের উন্নয়নে গনমুখী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্য না রাখলে স্বাস্থ্যখাত পরিনত হবে বিশাল এক বানিজ্যের বিষয়। স্বাস্থ্যই হলো দরিদ্র ও খেটে খাওয়া মানুষের একমাত্র সম্বল ও সম্পদ তাই কোন অপরাজনীতি যদি তাদের স্বাস্থ্যকেই রুগ্ন বা রোগাক্রান্ত করে দূর্বল করে দেয় তাহলে তারা কি করে খেটে খাবে। তাই দরিদ্র ও খেটে খাওয়া মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার জন্য ‘রাজনীতি’-কেই দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্য সহায়ক হতে হবে এবং এই লক্ষ্যে দরিদ্র ও খেটে খাওয়া মানুষদের নিজের দাবীর কথা নিজেদেরই বলতে হবে। 

বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে ঠিকই তবে বর্তমানে যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বিরাজ করছে তাতে গরীব জনগণের জন্য স্বাস্থ্যসেবা অনেকাংশেই নিশ্চিত হয়নি। সরকারি হাসপাতালের চেয়ে বেসরকারি হাসপাতাল গড়ে উঠেছে বেশি। পরিস্থিতি বিবেচনায় এটা বলা যায় যে, ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ মরিচিকা হিসেবেই রয়েছে।  যুগ যুগ ধরে এটাই ভাবা হতো যে কোন দেশের দৃঢ় অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রভাবেই সেদেশের মানুষের স্বাস্থের উন্নয়ন হয়ে থাকে। কিন্তু বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে বিশ্বের ১৮ জন বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ, নীতি-প্রণেতা এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ গবেষণার মাধ্যমে ঐ প্রথাগত ধারণার বিপরীতটাই প্রমাণ করেছেন। অর্থাৎ কোন একটি দেশের জনগোষ্ঠীর উন্নত স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার ফলেই সেদেশের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নতি সাধিত হয়েছে। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায় যে জনগণের স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় বৃদ্ধি করা হলে তা এ দেশের হাজার হাজার মানুষের জীবনই শুধু বাঁচাবে না বরং মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের সম্পদের সাশ্রয়ও হবে।

Saturday, April 20, 2013

তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন: বাস্তবায়নে ভাবনা

তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন: বাস্তবায়নে ভাবনা 
সৈয়দ মাহবুবুল আলম, আইনজীবী ও নীতিবিশ্লেষক

বাংলাদেশে ধূমপানসহ তামাক ব্যবহার হ্রাসের প্রচেষ্টা দীর্ঘদিনের। রেলওয়ে আইন ১৮৯০ -র ধারা ১১০-এ কামরায় ধূমপান নিয়ন্ত্রণে বিধি-নিষেধ আরোপের মাধ্যমে এ প্রচেষ্টার সূত্রপাত। রেলওয়ে আইনে সহযাত্রীর অনুমতি ব্যতীত ধূমপানের জন্য রেল কামরা থেকে বহিষ্কার এবং ২০ (বিশ) টাকা জরিমানার বিধান করা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯১৯  সালে কিশোরদের মাঝে ধূমপান নিয়ন্ত্রণে প্রণয়ন করা হয় জুবিনাইল এক্ট। তার প্রায় ৩৩ বছর পর ১৯৫২  সালে প্রেক্ষাগৃহে ধূমপান নিষিদ্ধ করার করার আইন প্রনয়ণ করা হয়। 
প্রেক্ষাগৃহে ধূমপান নিষিদ্ধ করার পর ১৯৭৬  সালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশে ধূমপান নিষেধ বিজ্ঞপ্তি প্রর্দশন করা কোন স্থানে ধূমপান করা হলে দন্ড আরোপের বিধান করা হয়। ঢাকার পর ১৯৭৮ সালে চট্রগ্রাম, ১৯৮৫ সালে খুলনা, ১৯৯২ সালে রাজশাহী, ২০০৬ সালে সিলেট ও বরিশাল মেট্রোপলিটন আইনে  অনুরোপ বিধান যুক্ত করা হয়।  
সিলেট ও বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশে ৩০০ টাকা জরিমানার বিধান থাকলেও অন্যান্য বিভাগের জন্য ধূমপান নিষেধ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি লংঘনের ক্ষেত্রে শাস্তির পরিমান ১০০ টাকা। ১৯৮৫ সালের পর ১৯৮৮ সালে প্রণয়ন করা হয় তামাকজাত সামগ্রী বিপণণ (নিয়ন্ত্রণ) আইন । ১৯৯০  সালে বলবৎ আইন অধিকতর শক্তিশালী করার লক্ষ্যে তামাকজাত সামগ্রী বিপনন (নিয়ন্ত্রণ) সংশোধন অধ্যাদেশ প্রণীত হলেও আলোর মূখ দেখেনি। সর্বশেষে কিছু আইন বাতিল ও কতিপয় আইনের বিধান বলবৎ রেখে প্রণয়ন করা হয় ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যে ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫। ২০০৬ সালে এই আইনের বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যে ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইনটি মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগায়। 
১৮৯০ সাল থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে মোট ১২ টি আইনের মাধ্যমে ধূমপান ও তামাক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে প্রচেষ্টা করা হয়। ২০০৫ সালে আইন প্রণয়নের পূর্বে ১৯১৯ এবং ১৯৮৮ সালের আইনব্যতীত অন্যান্য আইনের মুল বিষয় ছিল ধূমপান নিয়ন্ত্রণ। এ আইনগুলোতে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু স্থানকে ধূমপানমুক্ত করা হয়। এই আইনগুলো বাস্তবায়নে যথেষ্ট সফলতা অর্জন হয়েছে এমন জোরালে তথ্য প্রমাণ নেই। 
২০০৫ সালের তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে নির্দিষ্ট পাবলিক প্লেস ও পরিবহনে ধূমপান নিষিদ্ধ, তামাকজাত দ্রব্যের প্রত্যক্ষ বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ, প্যাকেটের গায়ে দৃষ্টিগোচর ভাবে পৃথক পৃথক স্বাস্থ্য সতর্কীবাণী প্রদানের বিধান করা হয়। এ আইনের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ, প্যাকেটের গায়ে সতর্কবানী নিশ্চিতে ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়। মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং ধূমপানমুক্ত স্থান বিষয়ে সচেতনতার বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে পাবলিক প্লেস ও পরিবহনে ধূমপান হ্রাস পায়। কিন্তু পাবলিক প্লেস ও পরিবহনে ধূমপান নিষিদ্ধ বিষয়ে মানুষের প্রত্যাশা অপূর্ণ থেকে গেছে।  
বিদ্যমান আইনের সীমাবদ্ধতা এবং প্রয়োগের নানা সমস্যাগুলো দূর করতে ধূমপান ও তামাকজাতদ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন-২০০৫ সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। বর্তমানে আইনটি বিল আকারে জাতীয় সংসদে পাশের অপেক্ষায় রয়েছে। ১৮৯০ হতে এ যাবত পাবলিক প্লেস ও পরিবহনে ধূমপান নিষিদ্ধ সংক্রান্ত আইন বাস্তবায়নে অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক ইত্যাদি প্রতিবন্ধকতাগুলো বিবেচনায় নিয়ে সংশোধনের জন্য অপেক্ষমান আইনটি বাস্তবায়নের বিষয়ে ভাবনা এখনই প্রকৃত সময়। 
বিগত সময়ে অভিজ্ঞতার আলোকে নিঃসন্দেহে বলা হয় ধূমপানমুক্ত স্থান সংক্রান্ত ধারা বাস্তবায়ন একটি চ্যালেঞ্জ। আইনের এই ধারা বিষয়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। আইনের সফলতা ও বিফলতা বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মানুষ এ ধারা বাস্তবায়নের বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে। 
তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধনীর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সমূহ সংক্ষিপ্ত  আকারে
সংশোধনী: তামাকজাত দ্রব্য ও কর্তৃত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা 
তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধনীতে সকল তামাক ও তামাকজাত দ্রব্যেকে  আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। ২০০৫ সালের আইন অনুসারে জর্দ্দা বা সাদাপাতার মতো তামাকজাত দ্রব্যেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো না। 
২০০৫ সালের তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে কর্তৃত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুনির্দিষ্ট ও সীমিত ছিল। সংশোধনীতে সরকারী গেজেট প্রজ্ঞাপন দ্বারা আরো কর্মকর্তাকে এ আইন বাস্তবায়নে সম্পৃক্ত করার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। 
সংশোধনী: ধূমপানমুক্ত স্থানের বিধান 
২০০৫ সালে ধূমপানমুক্ত স্থানের পরিধি কিছুটা নির্দিষ্ট ছিল। বিদ্যমান সংশোধনীতে ধূমপানমুক্ত স্থানের পরিধি, জরিমানা বৃদ্ধি করা হয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলো: 
১. পাবলিক প্লেসের সংজ্ঞায় নতুন সংযোজিত হয়েছে বেসরকারী অফিস, আচ্ছাদিত কর্মক্ষেত্রে, চতুর্দিকে দেয়াল দ্বারা আবদ্ধ রেষ্টুরেন্ট, মেলা বা পাবলিক পরিবহনে আরোহনের জন্য যাত্রীদের অপেক্ষার জন্য নির্দিষ্ট সারি, জনসাধারণ কর্তৃক সম্মিলিতভাবে ব্যবহার্য অন্য কোন স্থান অথবা সরকার বা স্থানীয় সরকার ঘোষিত যে কোন স্থান। 
২. পাবলিক প্লেসে জরিমানার পরিমান সর্বশেষ ৩০০ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। একই ব্যক্তি কর্তৃক দ্বিতীয়বার অপরাধের জরিমানা দ্বিগুন করা হয়েছে। 
৩.  পাবলিক প্লেস ও পরিবহনে ধূমপানমুক্ত সাইন স্থাপন না করার প্রেক্ষিতে জরিমানার বিধান করা হয়েছে। 
৪. পাবলিক প্লেস ও পরিবহন ধূমপানমুক্ত রাখার বিষয়ে কর্তৃপক্ষের উপর দায়িত্ব আরোপের বিধান সংযুক্ত করা হয়েছে। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে জরিমানা আরোপ করার বিধান রয়েছে।
সংশোধনী: তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ
তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধনীতে প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়া, ইন্টারনেটে তামাকজাত দ্রব্যের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি তামাকজাত দ্রব্যের প্রচারের উদ্দেশ্যে যে কোন ধরনের দান, অনুদান, বৃত্তি প্রদান নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া তামাকজাত দ্রব্য ক্রয়ে উৎসাহী করতে কোন নমুনা, বিনামূল্যে বা স্বল্পমুল্যে বিতরন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই বিধানে গুরুত্বপুর্ণ সংযুক্ত হচ্ছে নাটক সিনেমায় সিগারেটের দৃশ্য ব্যবহার নিষিদ্ধ, বিক্রয় স্থলে প্রচারনা বন্ধ, তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেট/কৌটা/মোড়কে অনুরূপ পন্য বিক্রয় নিষিদ্ধ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচীর আড়ালে তামাক কোম্পানির প্রচারণা কার্যক্রম নিষিদ্ধ অন্যতম। 
সংশোধনীতে ব্যক্তির পাশাপাশি কোম্পানিকে জরিমানার বিধান এবং জরিমানার পরিমাণ ১ লক্ষ টাকা করা হয়েছে। একই ব্যক্তি কর্তৃক দ্বিতীয়বার অপরাধের ক্ষেত্রে দ্বিগুন হারে জরিমানার বিধান রয়েছে। 
সংশোধনী: তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে স্বাস্থ্য সতর্কবাণী
আইনের সংশোধনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হচ্ছে তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবানী। এছাড়া লাইট, মাইল্ড, লো-টার, এক্সটা, আল্টা বা অনুরূপ কোন শব্দ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সংশোধনীতে ব্যক্তির পাশাপাশি কোম্পানিকে জরিমানার বিধান এবং জরিমানার পরিমাণ ২ লক্ষ টাকা করা হয়েছে। একই ব্যক্তি কর্তৃক দ্বিতীয়বার অপরাধের ক্ষেত্রে দ্বিগুন হারে জরিমানার বিধান রয়েছে। 
সংশোধনীর অন্যান্য বিষয়াবলী: 
তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধনীতে অপ্রাপ্ত বয়ষ্কদের নিকট তামাক বা তামাকজাত দ্রব্য ক্রয় ও বিক্রয় নিষিদ্ধ, অটোমেটিক ভেন্ডিং মেশিন স্থাপনে জরিমানা, জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল প্রতিষ্ঠা, তামাক ও তামাক জাতীয় ফসল উৎপাদন ও ব্যবহার নিরুৎসাহিতকরণে নীতিমালা প্রণয়নে বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে ভাবনা
তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০৫ সংশোধনের সিদ্ধান্ত মানুষের মাঝে ব্যাপক প্রত্যাশার সৃষ্টি করেছে। অনেকেই প্রত্যাশা করেছেন এ আইন সংশোধনের প্রেক্ষিতে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া আরো জোরদার হবে। মানুষের এই প্রত্যাশা পুরণের লক্ষ্যে আইনটি বাস্তবায়নে পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহন প্রয়োজন। 
তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনটির অন্যতম উদ্দেশ্য মানুষকে তামাক ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা। তাই সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ অপেক্ষা আইনটি পালনে মানুষকে কিভাবে উৎসাহী করা যায় সে বিষয়টি পরিকল্পনায় রাখা প্রয়োজন। অপরদিকে কোম্পানির ক্ষেত্রে আইনটি কঠোর প্রয়োগ বিষয়ে পদক্ষেপ জরুরি। বিগত সময়ে দেখা গেছে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ব্যক্তিকে ধূমপানমুক্ত স্থানে ধূমপানের জন্য জরিমানা করা হয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞাপন সংক্রান্ত ধারা ভঙ্গ করার জন্য তামাক কোম্পানিগুলোকে জরিমানা বা শাস্তি প্রদান করা হয়নি। ফলে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তরুণ সমাজকে উদ্ধুদ্ধ করার প্রচেষ্টা তামাক কোম্পানিগুলো নানাভাবে চালিয়ে যাচ্ছে।
বাস্তবায়নের সময় নির্ধারণ ও জনগনকে অবহিত করা
আইনটি সংশোধনের পর বিভিন্ন ধারা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। আইনের অনেক ধারা রয়েছে যেগুলো বাস্তবায়নের পুর্বে জনগণকে প্রস্তুত করা জরুরি। ধূমপানমুক্ত সংক্রান্ত ধারা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর উপকরণ বা অবকাঠামো তৈরি প্রয়োজন রয়েছে। প্যাকেট বা মোড়ক সংক্রান্ত ধারা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর প্রস্তুতি প্রয়োজন। সংশোধনীতে নিষিদ্ধ তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন অপসারণের জন্য স্বল্পতম সময় বেধে দিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ দেয়া প্রয়োজন। এ ধরনের প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম আইন বাস্তবায়নের পথকে সহজ করবে। 
আইনটি জাতীয় সংসদে পাশের পর সরকারীভাবে ব্যাপক প্রচারণা চালানো জরুরি। যাতে মানুষ আইনটি পালনের জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি নিতে পারে। বিগত আইনের ক্ষেত্রে দেখা গেছে আইন পাসের পর দ্রুত আইন কার্যকর করার ঘোষনা হয়েছে। কিন্তু আইনের বিধি তৈরি হয়েছে এক বছর পর। ফলে আইন প্রয়োগের বিভিন্ন বিষয়ে অস্পষ্টতার কারণে আইনটি বাস্তবায়নে ধীর বা জটিলতা সৃষ্টি হয়। একবার আইনভঙ্গ করার প্রবণতা সৃষ্টি হলে তা পালনে মানুষকে উৎসাহী করা কঠিন হয়ে পড়ে। 
সচেতনতা বৃদ্ধি, উপকরণ তৈরি ও অবকাঠামো উন্নয়ন
বাংলাদেশে ৪ কোটির বেশি মানুষ তামাক ব্যবহার করে। এ আইন বাস্তবায়নের সাথে এই বিশাল জনগোষ্ঠী সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে আইন পালনে উৎসাহী করা একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে কমলাপুর বাংলাদেশের একটি বৃহৎ রেল স্টেশন। এ স্টেশন দিয়ে প্রতিদিন ৫০,০০০ হাজারের বেশি মানুষ চলাচল করে। যাদের একটি বড় অংশ নিরক্ষর বা সাধারণ মানুষ। এই বিশাল স্টেশনটি আইন অনুসারে ধূমপানমুক্ত। কিন্তু এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত ধূমপানমুক্ত সাইন নেই যাতে বোঝা যাবে এ স্টেশনের কোথাও ধূমপান করা যাবে না। দেশের বাকী স্টেশনগুলোর অবস্থা অনুমান করা যায়। 
২০০৫ সালের আইনের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, আইনটি পাশের পর প্রথমদিকে সরকারীভাবে জনসচেতনতা কার্যক্রম খুবই সীমিত ছিল। বিভিন্ন গণমাধ্যমগুলোর রিপোর্টিং সচেতনতার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এছাড়া বেসরকারী সংগঠনগুলো ব্যাপক প্রচারণা চলায়। তবে বিশাল জনগোষ্ঠীর তুলনায় তা খুবই অপ্রতুল। ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে ধূমপানমুক্ত স্থান সম্পর্কে জানা সম্ভব হয়নি। অনেকের মাঝে এখনো ভুল ধারণা কাজ করে আইনে প্রকাশ্যে ধূমপান নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আর এ ধারণা থেকেই আইনটির সফলতা আর বিফলতা নির্ণয় করে থাকে।
এ আইনের অন্যতম উদ্দেশ্য মানুষকে তামাক ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা। মানুষকে আইন পালনে উৎসাহী করতে পাবলিক প্লেস ও পরিবহনে পর্যাপ্ত ধূমপানমুক্ত সাইন স্থাপন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ সাইন মানুষকে নিজ হতে আইন মানতে উৎসাহী করবে। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের বর্তমান সংশোধনীতে ধূমপানমুক্ত সাইন স্থাপনের দায়িত্ব পাবলিক প্লেস ও পরিবহনের কর্তৃপক্ষের উপর অর্পন করা হয়েছে। পাশাপাশি ধূমপানমুক্ত স্থান রক্ষায় কর্তৃপক্ষের করণীয় বিষয়ে বিধি তৈরির জন্য সরকারকে ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। আইনটি কার্যকর করার পূর্বে পাবলিক প্লেস ও পরিবহন বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, ধূমপানমুক্ত সাইন স্থাপন এবং কর্তৃপক্ষকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করা জরুরি। 
দক্ষতা বৃদ্ধি ও সমন্বয় সাধন
২০০৫ সালের আইন অনুসারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা এবং পুলিশের এ এস আই পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের কর্তৃত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ক্ষমতা প্রদান করা হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যেহেতু নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে তাদের এ আইন বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যক্ষ করা যায়। তবে অপর দুই কর্মকর্তার এ আইন বাস্তবায়নে ভূমিকা সুস্পষ্ট ছিল না বিধায় আইন বাস্তবায়নে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহন পরিলক্ষিত হয়নি। এসব কর্মকর্তার কাজের পরিধি ও দায়িত্ব সম্পর্কে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ক্ষমতায়ন করা হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন মোবাইল কোর্টই ছিল ধূমপানমুক্ত সংক্রান্ত বিধান বাস্তবায়নে একমাত্র পন্থা। তবে পরে দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেক সংস্থাই নিজস্ব ও অধীনস্ত প্রতিষ্ঠান ধূমপানমুক্ত করার মাধ্যমে এ কার্যক্রমকে গতিশীল করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে, যা প্রশংসার দাবিদার। 
ধূমপানমুক্ত স্থান বিষয়ে প্রশংসনীয় পদক্ষেপ গৃহীত হলেও, তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ এবং প্যাকেটের গায়ে স্বাস্থ্য সতর্কবাণী বিধান বাস্তবায়নে পদক্ষেপ ছিল খুবই সীমিত। অপ্রাপ্ত বয়স্কদের নিকট তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় নিষিদ্ধে উল্লেখ্যযোগ্য কোন পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়নি। তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধের বিধান সম্পর্কে কোম্পানিগুলো প্রতিনিয়ত বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। কর্তৃত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাজের পরিধি ও দায়িত্ব সম্পর্কে দক্ষতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হলে কাঙ্খিত ফলাফল পাওয়া সম্ভব হতো। 
বর্তমান সংশোধনীতে আইনটির ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বৃদ্ধি পাবে কর্তৃত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং সম্পৃক্ত হবে বিভিন্ন সংস্থা। আর এ বিষয়গুলোর সমন্বয় সাধন আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আইন সম্পর্কে কোন অস্পষ্টতা হলে কোথায় যোগাযোগ করবে, আইনটি বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতাগুলো কিভাবে সমাধান করবে, কর্তৃত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কর্মএলাকা বা কাজের পরিধি নির্ধারণ ইত্যাদি বিষয়ে একটি সহযোগি সংস্থা জরুরি। সংশোধনীতে প্রস্তাবিত জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল এ ক্ষেত্রে আমাদের আশার আলো। সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের জনগন ও কোম্পানির সাথে সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো কার্যকর করার সময় নির্ধারণের পূর্বে জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের কাঠামো চুড়ান্ত ও কার্যকর করার পদক্ষেপ গ্রহণ খুবই জরুরি। 
ধূমপানমুক্ত স্থান সংক্রান্ত বিধানে সহজ বাস্তবায়ন
তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধনীতে ধূমপানমুক্ত সংক্রান্ত বিধান বাস্তবায়নে ২টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। প্রথমত ধূমপানমুক্ত স্থানে ধূমপানের ক্ষেত্রে ব্যক্তির জরিমানার বিধান করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত পাবলিক প্লেস বা পরিবহন ধূমপানমুক্ত রাখার দায়িত্ব কর্তৃপক্ষ, তত্ত¦াবধায়কের উপর অর্পন করা হয়েছে। নতুন নতুন স্থান আইনে যুক্ত করার পাশাপাশি এ ধরনের বিধান আইনের পরিধি ও ব্যাপকতা বৃদ্ধি করেছে। তাই আইনটি বাস্তবায়ন নিশ্চিতে নতুন পন্থা বা উপায়ের বিষয়ে চিন্তা জরুরি। 
পাবলিক প্লেস ও পরিবহনে ধূমপানের জন্য জরিমানা আদায়ের ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্ট একটি প্রচলিত পদ্ধতি। তবে দেশের সব পাবলিক প্লেস বা পাবলিক পরিবহনে সব সময় মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা আদায় সম্ভবপর নয়। যেমন চলন্ত লঞ্চ, মধ্যরাতে কোন পাবলিক প্লেস বা পরিবহন বা গ্রামের কোন পাবলিক প্লেস বা পরিবহন। সামাজিক, মানবিক, সীমিত লোকবলসহ নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে কোন ব্যক্তি পাবলিক প্লেস বা পরিবহনে ধূমপান করলে কর্তৃত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কর্তৃক তাদের গ্রেফতার করে সুদীর্ঘ পথ পারি দিয়ে নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটের নিকট উপস্থিত করা সম্ভব নাও হতে পারে। 
এ সমস্যা হতে উত্তরণে আইনটি বাস্তবায়নে জনসাধারণকে স্বউদ্যোগে জরিমানা প্রদানে উৎসাহী করার কার্যক্রম চিন্তা করা যেতে পারে। যেমন জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল একটি নম্বর (৩১০৫) থাকবে, যা একজন নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটের। কোন কর্তৃত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কোন ব্যক্তিকে ধূমপানমুক্ত স্থানে ধূমপানরত অবস্থায় দেখতে পেলে, তাকে আইন লঙ্গনের বিষয়ে অবহিত করে, আইনে বর্ণিত শাস্তি পালনে ২টি প্রস্তাব করবেন। প্রথমত তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে স্বেচ্ছায় (৩১০৫) নম্বরে মোবাইলের মাধ্যমে জরিমানা প্রদান করতে পারে। স্বেচ্ছায় এ আইনের জরিমানা প্রদানের ক্ষেত্রে পরিমাণ ২০০ (দুইশত) টাকা। যদি ব্যক্তি স্বেচ্ছায় জরিমানা প্রদান করে তবে তার মোবাইলে জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট হতে নির্দিষ্ট ফরমেট জরিমানা আদায় সংক্রান্ত তথ্য চলে আসবে। 
দ্বিতীয়ত হচ্ছে যদি অভিযুক্ত স্বউদ্যোগে জরিমানা প্রদানে অস্বীকার করেন তবে তাকে নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটের নিকট অভিযোগ প্রমাণ ও জরিমানা আদায়ে নিয়ে যেতে হবে। সেক্ষেত্রে জরিমানার পরিমান ৩০০ (তিনশত) টাকা। 
পাবলিক প্লেস ও পরিবহনে ধূমপানের স্থান নির্ধারনের বিধান এখনো বলবৎ রয়েছে। আইনের এই বিধান ধূমপানমুক্ত স্থানের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পাবলিক প্লেস ও পরিবহনের সন্নিকটে বা অভ্যন্তরে কোনভাবেই ধূমপানের স্থান রাখা যৌক্তিক নয়। বিগত দিনের মতো আইনের বিধির মাধ্যমে পাবলিক প্লেস ও পরিবহন সম্পূর্ণ ধূমপানমুক্ত রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। 
ব্যক্তির ক্ষেত্রে জরিমানা আদায়ে এ পদ্ধতির পাশাপাশি বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, রেষ্টুরেন্ট, শিল্প প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পাবলিক পরিবহনে ইত্যাদি স্থানে ধূমপানমুক্ত সাইন স্থাপন এবং ধূমপানমুক্ত রাখা বিধান বাস্তবায়নে বিকল্প চিন্তা জরুরি। পাবলিক পরিবহনের ধূমপানমুক্ত সংক্রান্ত বিধান বাস্তবায়নে ট্রাফিক সার্জনদের ক্ষমতায়িত করার চিন্তা করা প্রয়োজন। এছাড়া কারাখানা পরির্দশক, স্যানিট্যারি অফিসার, শিক্ষা কর্মকর্তাদের কিভাবে এ আইন বাস্তবায়নে ক্ষমতায়িত করা যায় তাও ভাবনা উচিত। প্রতিটি ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ক্ষমতায়ন করা সম্ভব হলে আইনের বাস্তবায়ন অনেক সহজ হবে। 
আইনের সংশোধনীতে স্থানীয় সরকারকে ধুমপানমুক্ত স্থান ঘোষণার ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার কিভাবে ধুমপানমুক্ত স্থান ঘোষণা করবে, কারা কিভাবে এ আইন বাস্তবায়ন করবে সে বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে নির্দেশনা থাকা জরুরি। অন্যথায় আইন বাস্তবায়নে বিভিন্ন স্থানীয় প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, যাতে আইন সম্পর্কে মানুষের মাঝে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতে পারে। 
আইনভঙ্গের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় অভিযোগের সুবিধা : 
তামাকজাত দ্রব্যের আইনভঙ্গের ক্ষেত্রে জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলে ফ্যাক্স, ইমেইল বা চিঠির মাধ্যমে অভিযোগ প্রদানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এই অভিযোগ কেন্দ্র সম্পর্কে জনসাধারণের মাঝে ব্যাপক সচেতন করা যেতে পারে। যাতে মানুষকে আইনভঙ্গের বিষয়ে অভিযোগ দাখিল করে। এ প্রক্রিয়া সরকারের আইন মনিটরিং ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সহজতর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালণ করবে। 
তামাক ও তামাক জাতীয় ফসল উৎপাদন ও ব্যবহার নিরুৎসাহিতকরণ: ২০০৫ সালের আইনের তামাকজাত দ্রব্যের উৎপাদন, ব্যবহার, শিল্প স্থাপনের লক্ষ্যে নীতিমালা প্রণয়নের বিধান ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনেও এই নীতিমালা প্রণয়ন হয়নি। সংশোধিত আইনের তামাকজাত দ্রব্য উৎপাদন ও ব্যবহার নিরুৎসাহিতকরণ, শিল্প স্থাপন, তামাক জাতীয় ফসল উৎপাদন ও চাষ নিরুৎসাহিত করার জন্য যে সকল নীতিমালা প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে, তা প্রনয়ণের কাজ শুরু থেকে করা উচিত। এ সকল নীতিমালা প্রনয়ণের ক্ষেত্রে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সম্পৃক্তকরণ থাকলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এ বিষয়ে নেতৃত্ব নেয়া উচিত। 
পরিসমাপ্তি: ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫ সংশোধনে পদক্ষেপ জনস্বাস্থ্য রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আমরা প্রত্যাশা করি এ আইনের কার্যকর বাস্তবাযন জনস্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সাধন করা সম্ভব হবে। দেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করতে সরকারকে এ আইন বাস্তবায়নে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করা আমাদের সকলের কর্তব্য। 
 প্রবন্ধটি তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন: বাস্তবায়নে ভাবনা শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক, ২০ এপ্রিল ২০১৩, বিলিয়া অডিটরিয়াম এ উপস্থাপন করা হয়