Showing posts with label পরিবেশ. Show all posts
Showing posts with label পরিবেশ. Show all posts

Monday, June 20, 2016

রিকশা যাত্রীদের কথা ভাবতে হবে

অনেকেই হয়তো জানা নেই, ঢাকার রিকশা গিনেস ওয়াল্ড বুকে স্থান পেয়েছে। ২০১৫ সালের ওয়ার্ল্ড গিনেজ রেকর্ডস বইটির ১৮৮ পৃষ্ঠার ‘আরবান ট্রান্সপোর্ট’ অংশে ‘মোস্ট সাইকেলস রিকশা ইন ওয়ান সিটি’ শিরোনামে এটি প্রকাশ করা হয়েছে। এ ছবিগুলো একজন রিকশার প্রেমীর উদ্যোগ। ধন্যবাদ এ মানুষগুলোকে রিকশার জন্য এধরনের উদ্যোগ গ্রহনে। রিকশা একটি পরিবেশ বান্ধব বাহন। ঢাকার অধিকাংশ মানুষ রিকশা ব্যবহার করেন বা করতে হয়।


কিন্তু এ রিকশাকে ঢাকার যাতায়াত পরিকল্পনায় স্থান দেয়া হয় না। নিজস্ব সুবিধা চিন্তাকারী পরিকল্পনাবিদ, নীতিনির্ধারক, সিদ্ধান্তগ্রহণকারী এবং আইন প্রয়োগকারীরা প্রাইভেট গাড়ীর সুবিধা নিশ্চিত করতে গিয়ে রিকশার যাত্রীদের জন্য সারা শহরে এক নরক যন্ত্রণার সৃষ্টি করেছে। ছবি ইন্টারনেট রিকশা

২০০৪ সালে বিশ্ব ব্যাংকের পরামর্শ অনুসারে (যদিও বিশ্বব্যাংক অস্বীকার করে) ঢাকার রাস্তা হতে রিকশা বন্ধের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। তৎকালীন ডিটিসিবি, সিটি কপোরেশন এবং ট্রাফিক বিভাগ রিকশা বন্ধের লক্ষে নানা পদক্ষেপ গ্রহন করে। রিকশা না চলা, রাস্তার নাম করা হয় ভিআইপি রোড।

বিশ্ব ব্যাংকের গবেষণার অনুসারে সুকৌশলে রাস্তার বিভিন্ন রাস্তায় রিকশার চলাচল বন্ধ করা হয়। মানুষকে প্রাইভেট গাড়ী ক্রয়ে উৎসাহী করতে সুকৌশলে এ নীতি গ্রহণ করা হয় (২০০৪ হতে ২০১৬ গাড়ী বৃদ্ধির চিত্র প্রমান)। ভিআইপি নামক রাস্তার বিভিন্ন সংযোগগুলো বন্ধ করে দেয়া হয় ফলে রিকশাকে অনেক ঘুরে যেতে হয়।

কয়েকটি রাস্তায় নাম মাত্র লেন করা হয় টাকা খরচ করে, কিন্তু নানা সমস্যায় লেন কাজ হয়নি। সাইন্সল্যাব নিউমাকেটের রিকশার লেনটি আজ ১২ বছরে একবারে জন্যও ঠিক করা হয়নি। রিকশার চালকরা এ সমস্যাগুলোর সুযোগ নিয়েছে আর ভাড়া বাড়িয়েছে।

আজ ভিঅাইপি রোডে ভিআইপিরা চলেন। কিন্তু এদেশে অনেক সাধারণ নাগরিক আছেন তাদের রিকশায় চলতে হয়। তাদের অবস্থা নীতিনিধারকদের ভাবতে হবে। ঢাকার অধিকাংশ সরকারী বেসরকারী হাসপাতালে আজ রিকশায় রোগী নেয়া যায় না। এ্যামবুলেন্স ভাড়া... প্রায় ১০০০ থেকে ১৫০০ আর সিএনজি তো তাদের পুরোনা অভ্যাসে ফিরে গেছে।

রিকশা বন্ধ হওয়ায় অনেক মানুষ তাদের সন্তানদের মোটর সাইকেলে নিয়ে চলাচল করেন। অনেকে বাধ্য হয়ে গাড়ি নিয়ে বের হয়। রিকশা ঢাকার জন্য একটি বাস্তবতা আর তাই রিকশা যাত্রীদের চলচালের জন্য যোগাযোগ মন্ত্রী এবং মেয়রগণের নজর দেয়া জরুরি।

সুপারিশ
১) ঢাকার রিকশা চলাচালের রাস্তাগুলো জরুরি ভিত্তিতে ঠিক করা।
২) রিকশার ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করা।
৩) মুল সড়কগুলোর আসে পাশে চলাচলে সংযোগ সড়ক বৃদ্ধি করা।
৪) জোন ভিত্তিক রিকশা চলাচলে পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে।






Wednesday, March 18, 2015

বাংলাদেশে পানির অবস্থা

বিশুদ্ধ পানি
মানুষের জীবন পানির সাথে একসূত্রে গাঁথা। এই ভূ-পৃষ্ঠের যেমন ৭০ ভাগই পানিতে ঢাকা, তেমন আমাদের শরীরেরও প্রায় ৭০ ভাগ পানি। শুধু আমাদের জীবনই নয়, পৃথিবীর সব জীব-জন্তু, কীট-পতঙ্গ, গাছপালা সবকিছুর জীবনই এই পানির ওপর নির্ভরশীল। তাছাড়া আমাদের দৈনন্দিন যাবতীয় কাজ, চাষাবাদ, শিল্প-কারখানায় উৎপাদন সবকিছুর জন্যই আমরা পানি উপর নির্ভরশীল। এক কথায় পানি হলো এমন একটি প্রাকৃতিক উপাদান, জীবনের জন্য যার কোন বিকল্প নেই।

বিশ্বের প্রায় ৮০ টি দেশে নিরাপদ পানির সমস্যা রয়েছে এবং পৃথিবীর প্রায় ৪০ ভাগ মানুষ পানির জন্য সংগ্রাম করছে। শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এ শতকে বিশ্বে মিঠা পানির ঘাটতি ২০ভাগ বাড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা আশংকা করছে। বাংলাদেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন একটি বিশাল সমস্যা। গবেষকদের মতে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে প্রতিবছর দেশের ৭ হাজার কোটি টাকা বাঁচবে।

বিশুদ্ধ পানির অভাবে সৃষ্ট সমস্যা ঃ 
ভূ-গর্ভের চার ভাগের তিন ভাগ পানিতে পরিপূর্ণ হলেও মানুষের ব্যবহারের উপযোগী পানি মাত্র এক ভাগ। বিশ্ব ব্যাংকের হিসাব অনুসারে সুপেয় পানির অভাবে ও দূষিত পানি পানের কারণে প্রতিবছর মারা যাচ্ছে সোয়া কোটি মানুষ। সাধারণত খাওয়া, গোসল, রান্নাবান্না ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন একজন মানুষের গড়ে ৫০ লিটার পানি প্রয়োজন। অথচ বর্তমানে পৃথিবীতে ১১০ কোটি মানুষ প্রতিদিন পান করার জন্য পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পায় না। 

পানি দূষণের কারণে বাংলাদেশে ডায়ারিয়া ও অন্যান্য পানি বাহিত রোগ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিলীন হচ্ছে জলজ প্রাণী এবং উদ্ভিদ। এছাড়া অনেক মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলে গবেষকগণ মতামত প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশের ৮ কোটি মানুষ আর্সেনিকের ঝুঁকিতে রয়েছে এবং প্রতিনিয়ত এভাবে চলতে থাকলে সমস্যা মহামারির আকার ধারণ করতে পারে। গত এক যুগে দেশের ৬১ জেলার ২৭০ উপজেলায় আর্সেনিক দূষণযুক্ত পানির কারণে বিভিন্ন বয়সের প্রায় ৪০ হাজার মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশে আর্সেনিকজনিত ক্যান্সারের কারণে ২০০,০০০-২৭০,০০০ মানুষের মৃত্যু হতে পারে বলে আশংকা করছে। গবেষণায় দেখা যায় দেশের ৩০ ভাগ নলকূপের পানি আর্সেনিক দূষণে দূষিত এবং প্রতিদিন দুষণের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষি কাজ ও চাষাবাদের জন্য পানি একটি বড় বিষয়। বর্তমানে চাষাবাদের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা হয়। শহর অঞ্চলেও ধীরে ধীরে পানির সংকট প্রকট হয়ে উঠছে। ফলে দেশের অধিকাংশ বিভাগীয় ও জেলা শহরেরই পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে।  হ্রাস পাচ্ছে সুপেয় পানির পরিমান। 

বাংলাদেশে পানির উৎসঃ 
পানি সম্পদের দিক দিয়ে বাংলাদেশ অত্যন্ত সম্পদশালী। এর ভূ-পৃষ্ঠে যেমন আছে পদ্মা- মেঘনা- যমুনার মত প্রমত্তা নদী, তেমনি ভূ-গর্ভেও রয়েছে সুপেয় পানি। এদেশের বুকের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে ছোট-বড় প্রায় সাতশ নদ-নদী এবং অসংখ্য খাল-বিল, দীঘি-পুকুর ও হাওর-বাঁওড়। বর্ষাকালে সারাদেশ পানিতে থৈ থৈ করে। বাংলাদেশে বাৎসরিক গড় বৃষ্টির পরিমান প্রায় ২০৫০ মিলিমিটার। আর বর্ষাকালে অর্থাৎ জুন থেকে অক্টোবরের মধ্যে ৮০% ভাগ বৃষ্টি হয়। কিন্তু আমাদের অবহেলা ও অপরিকল্পনার কারণে পানির উৎস আজ হুমকির সম্মুখীন। 

Friday, July 4, 2014

পরিবেশ রক্ষায় পরিবেশ আইন ও আদালত

পরিবেশ সংরক্ষণে বাংলাদেশের আজকের অবস্থা পরিবেশবাদীদের আন্দোলনের ফসল। এ আন্দোলনকে পরিবেশবাদী সংগঠন, গণমাধ্যম, সাধারণ জনগণ এবং কিছু ক্ষেত্রে সরকারী সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। নানা প্রতিকুলতা ও প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়েও বাংলাদেশে পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধি, আইন ও নীতি প্রণয়নে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য সরকার ও স্থানীয় সরকারের সংস্থাগুলোর দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহীতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আন্দোলন কর্মীরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে অব্যাহতভাবে চাপ সৃষ্টি করে চলেছে। দেশের অনেক স্থানেই মানুষ সংঘবদ্ধভাবে পরিবেশ সংরক্ষণে আন্দোলন করছে। এ আন্দোলনকে কার্যকর ও প্রাতিষ্ঠিকীকরণের লক্ষ্যে পরিবেশ সংরক্ষণে আইন ও পরিবেশ আদালতের গুরুত্ব অনেক।
পরিবেশ সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান
শুধুমাত্র পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের পরিবেশ সংরক্ষণ সম্ভব নয়। বরং রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করতে হবে। স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠান সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদ পরিবেশ সংরক্ষণে তৃণমুলল পর্যায়ে সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। স্থানীয় সরকারের সংস্থাগুলো নিজস্ব ক্ষমতা প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবেশ আদালতের মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ পালন করতে পারে।
বাংলাদেশ সংবিধান ও পরিবেশ
বাংলাদেশ সংবিধানের ১৮ক অনুচ্ছেদ এ পরিবেশ রক্ষায় রাষ্ট্রের উপর অত্যাবশ্যকীয়ভাবে দায়িত্ব অর্পন করা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ১৮ বলা হয়েছে ‘‘রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীব-বৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণির সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করিবেন’’। বর্তমান ও ভবিষ্যতের নাগরিকের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ করা রাষ্ট্রের পক্ষে সরকারের দায়িত্ব।
পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫
পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের অধীন একটি স্বতন্ত্র পরিবেশ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকে পরিবেশ সংরক্ষণে ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। মহাপরিচালকের গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলীর মধ্যে রয়েছে, পরিবেশ আইনের উদ্দেশ্য পুরণকল্পে কোন কর্তৃপক্ষ বা সংস্থার সাথে সমন্বয় সাধন, পরিবেশ অবক্ষয় ও দুষণের বিরুদ্ধে প্রতিকারমূলক কার্যক্রম, বিপজ্জনক পদার্থের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, পরিবহনের বিষয়ে পরামর্শ প্রদান, পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়ে গবেষণা, পরিবেশ দুষণ প্রতিরোধে আদেশ বা নির্দেশ প্রদান, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষের সহায়তা গ্রহণ করা। পানীয় জলের মান নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ প্রদান।
এছাড়া প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা, ক্ষতিকর ধোঁয়া সৃষ্টিকারী যানবাহন সম্পর্কে বাধা-নিষেধ, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর সামগ্রী উৎপাদন, বিক্রয় ইত্যাদির উপর বাধা-নিষেধ, পাহাড় কাটা সম্পর্কে বাধা-নিষেধ, ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য উৎপাদন, আমদানী, মজুদকরণ, বোঝাইকরণ, পরিবহন ইত্যাদি সংক্রান্ত বাধা-নিষেধ, জাহাজ কাটা বা ভাঙ্গার কারণে সৃষ্ট দূষণ সংক্রান্ত বাধা-নিষেধ, জলাধার সম্পর্কিত বাধা-নিষেধ, প্রতিবেশ ব্যবস্থার ক্ষতির ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর অতিরিক্ত পরিবেশ দুষক নির্গমন ইত্যাদি, প্রবেশ ইত্যাদির ক্ষমতা, নমুনা সংগ্রহের ক্ষমতা, পরিবেশগত ছাড়পত্র, পরিবেশ নির্দেশিকা প্রণয়ন, আপীল, দন্ড, অপরাধের সহিত সংশ্লিষ্ট বস্তু, যন্ত্রপাতি বাজেয়াপ্তকরণ, ক্ষতিপূরণের মামলা দায়ের করার ক্ষমতাও রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে পরিবেশ দখল ও দুষণকারীদের বিরুদ্ধে শা¯স্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে আসছে। এবং গণশুনানি পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি ব্যতিক্রমধর্মী ও সময় উপযোগী উদ্যোগ।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সীমাবদ্ধতা
পরিবেশ আইনে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিবর্তে মহাপরিচালকের পদটিকে ক্ষমতায়িত করা হয়েছে। যা প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতায়ন ও বিকাশের অন্যতম অন্তরায়। মহাপরিচালকে পরিবেশ দুষণকারী ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব জব্দ বা স্থগিত করার ক্ষমতা প্রদান জরুরি। মহাপরিচালকের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপীল কর্তৃপক্ষ এখনো সুপষ্ট নয়। পরিবেশ দুষণ প্রতিরোধে অধিদপ্তরের প্রশিক্ষিত ও দক্ষ লোকবলেরও অভাব রয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর বর্তমানে পরিবেশ দুষণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। তবে পরিবেশ দুষণ প্রতিরোধে এ সংস্থার অর্জন আশানূরূপ নয়। রাষ্ট্রীয় অন্যান্য সংস্থাগুলোর পরিবেশ দুষণ বা পরিবেশ সংরক্ষণে দায়বদ্ধতা সৃষ্টিতে এ সংস্থা এখনো জোরালো ও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে পারছে না। পরিবেশ সংরক্ষণে এ প্রতিষ্ঠানের অর্জন বা ব্যর্থতার ক্ষেত্রে বাৎসরিক প্রতিবেদন বা জবাবদিহীতার ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি।
পরিবেশ আদালত
পরিবেশ আদালত আইন ২০০০ সালে প্রথম প্রণীত হয়। কিন্তু নানা সীমাবদ্ধতার কারণে আইনটিতে জনসম্পৃক্ততা সৃষ্টি হয়নি। উক্ত আইন অনুসারে সাধারণ নাগরিক সরাসরি মামলা দায়ের করতে পারতো না। পরিবেশ আদালত শুধমাত্র ঢাকা ও চট্টগ্রাম এই দুটি বিভাগীয় শহরেই ছিল। এছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরও আইনটির কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেনি।
২০১০ সালে পরিবেশ আদালত আইন সংশোধিত আকারে প্রণীত হয়। এ আইনে পরিবেশ আদালত, স্পেশাল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালত, আপীল আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়। আইনে পরিবেশ আদালত ও স্পেশাল ম্যাজেষ্ট্রেটের এখতিয়ার সুপষ্ট করা হয়। এ আদালতের ক্ষতিপুরণ আদায়, পরিদর্শন, আটক, জব্দ করা ক্ষমতা প্রদান করা হয়। আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা, তদন্ত, ও পরিদর্শন পদ্ধতি সুপষ্ট করা হয়। এ আদালতকে আপোষ ও মীমাংসার, অর্থদন্ড হতে খরচ বা ক্ষতিপূরণ প্রদানের ক্ষমতাও প্রদান করা হয়।
পরিবেশ আদালত আইন ২০১০ কতিপয় বৈশিষ্ট্য
১.      যে কোন ব্যক্তি সরাসরি মামলা দায়ের করতে পারে।
২.      পরিবেশ অধিদপ্তরের জন্য স্পেশাল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালত রয়েছে।
৩.      প্রতিটি জেলায় স্থাপনের বিধান করা হয়েছে।
৪.      অর্থদন্ড হইতে খরচ বা ক্ষতিপূরণ প্রদানের ক্ষমতা রয়েছে।
৫.      আপোষ ও মীমাংসার ক্ষমতা রয়েছে।
৬.      পৃথক আদালত হিসেবে মর্যাদা ও অবকাঠামো রয়েছে।
পরিবেশ আদালতের মামলার অবস্থা
বর্তমানে বিদ্যমান ৩টি পরিবেশ আদালতে গত ৫ বছরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। এরমধ্যে ২০০৯ সালে ৭১টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়, যার ২৬টি নিষ্পত্তি হয়। ২০১০ সালে মামলা হয় ৮১টি এবং নিষ্পত্তি হয়েছে ১৯টি। ২০১১ সালে হওয়া ৮৮টি মামলার মধ্যে ১৩টি নিষ্পত্তি হয়। ২০১২ সালে ৪৮টি মামলা হয়, যার মধ্যে নিষ্পত্তি হয় ৫টি। এছাড়া ২০১৩ সালে ৩৮টি মামলা হয়, এরমধ্যে একটিও নিষ্পত্তি করা হয়নি। ২০১৪ সালের মে পর্যন্ত ৬টি মামলার সবগুলো এখনও অনিষ্পন্ন রয়েছে। মন্ত্রী জানান, পরিবেশ অধিদপ্তরের জনবল স্বল্পতা, আদালত থেকে মামলা সম্পর্কিত কাগজপত্র প্রাপ্তি বিলম্ব এবং সাক্ষীর অনিশ্চয়তার কারণে মামলা নিষ্পত্তির হার কম।
  
বিভাগসালে পরিবেশ আদালত আইনের অধীন মামলাঅন্যান্যপূর্ববর্তী মামলা
ঢাকা৫টি১০০টি
চট্টগ্রামপরিবেশ আদালতে মামলা ৩ টিনগরীর বিভিন্ন থানায় ৪ টি২৪৩ টি

পরিবেশ আদালত ও বর্তমান অবস্থা
  • ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটে ৩ টি পরিবেশ আদালত রয়েছে এবং ঢাকায় ১ টি পরিবেশ বিষয়ক আপীল আদালত রয়েছে।
  • পরিবেশ আদালত ও সরাসরি মামলা দায়ের করার বিষয়ে অনেকের ধারণা নেই।
  • ঢাকায় যুগ্ম জেলা জজের অধীনে পরিবেশ বিষয়ক আদালত ‘মামলাশূন্যতায়’ অর্থাৎ বলা যায় অনেকাংশে নিস্ত্রিয়।
  • মামলা পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রের একজন কৌঁসুলি ও বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মচারী রয়েছে। কিন্তু মামলার সংখ্যা কম হওয়ায় এ আদালতে এখন সাধারণ দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলারই বিচার চলে।
  • আদালত নিয়ম অনুসারে পরিবেশ অধিদপ্তরের কাজে প্রতিবেদন চান এ আদালত। কিন্তু তারিখের পর তারিখ পার হলেও অধিদপ্তর প্রতিবেদন না দেয়ায় মামলার নিষ্পত্তি আর হয় না।
  • পরিবেশ অধিদপ্তরের ভ্রাম্যমাণ আদালত জরিমানার মাধ্যমে অনেক অভিযোগের নিষ্পত্তি করে দেয়। ফলে ঢাকাসহ দেশের পরিবেশ আদালতগুলোতে পর্যাপ্ত মামলা আসে না।
  • পরিবেশ অধিদপ্তর পরিচালিত অভিযানে প্রতি সপ্তাহেই এ রকম দোষী প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়। কিন্তু কিছুদিন পর তারা আবারো একই ধরনের অপরাধে জড়ায়।
  • বিচারপ্রার্থীদের অভিযোগ, অধিদপ্তর ও আদালতের কাজে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। মামলা তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা ও বিচার বিলম্বিত হয় বলে ক্ষতিগ্র¯Í অনেকেই আদালতে যেতে চান না।
  • দেশের প্রত্যেকটি জেলায়ই পরিবেশ বিষয়ক আদালত স্থাপন করা জরুরি। শুধুমাত্র ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটে মাত্র ৩টি পরিবেশ বিষয়ক আদালত রয়েছে। আর সে আদালতগুলোও আবার মামলা শূন্য। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিবেশ দূষণের মামলার বিচারে পর্যাপ্ত ভূমিকা রাখতে পারছে না।
পরিবেশ সংরক্ষণের আইনী ব্যবস্থা দেশব্যাপী থাকতে হবে
ইতিমধ্যে বাংলাদেশে উচ্চ আদালত পরিবেশ সংরক্ষণের লক্ষ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করেছে। বিগত কয়েক বছরে পরিবেশ রক্ষায় অনেকগুলো রীট হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু উচ্চ আদালতে দেশের অনেক প্রান্ত হতে অনেকে পক্ষেই এসে প্রতিকার পাওয়া সম্ভব নয়। তাই পরিবেশ অধিদপ্তর ও পরিবেশ আদালত প্রতিকারের প্রাপ্তির ব্যবস্থাকে জনগণের কাছে নিয়ে যেতে হবে। যাতে মানুষ সহজে নিজের এলাকার পরিবেশ ধ্বংসের প্রেক্ষিতে প্রতিকারের জন্য আদালতের শরণাপন্ন হতে পারে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত রিট মামলা (পরিবেশ বিষয় রিট মামলার সংখ্যা)
সময়রিটের সংখ্যাক্রমপুঞ্জিতরিটের সংখ্যানিষ্পত্তিকৃত রিটের সংখ্যাক্রমপুঞ্জিত নিষ্পত্তিকৃত রিট
২০০৯২৩৫২৩৫১০১০
২০১০১২৩৩৫৮০১১১
২০১১৯৬৪৫৪৯৮১০৮
২০১২৩৫৪৯৮১৬১২৫
২০১৩৭৯৮৬৮১১১৪১
সুপারিশ
১.      পরিবেশ আদালত সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
২.      পরিবেশ আদালতে মামলায় উৎসাহ বা সহযোগিতা প্রদান
৩.      স্থানীয় বেসরকারী সংস্থাদের পরিবেশ আইন ও আদালত বিষয়ে দক্ষতা বাড়ানো
৪.      পরিবেশবাদী সংস্থাগুলো পরিবেশ আদালতে মামলা দায়ের ও প্রতিবন্ধকতাগুলো নিরুপন
৫.      প্রতিজেলায় পরিবেশ আদালত সৃষ্টিতে জনমত সৃষ্টি
৬.      পরিবেশ আদালত ও অধিদপ্তরের সমন্বয় সৃষ্টি
৭.      আইন ও নীতি বিষয় সার্পোট ইউনিট তৈরি করা যেতে পারে।
৮.      পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর পক্ষ হতে সম্মিলিতভাবে পরিবেশ আদালতে একটি মামলার করা। যাতে বাস্তব সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব হয়।
বাংলাদেশে পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে পরিবেশবাদীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণে দেশের স্থানীয় জনগণ যাতে সহজে আদালতের শরণাপন্ন হতে পারে এ লক্ষ্যে পরিবেশবাদীদেরই উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা প্রত্যাশা করি আজকের সভা এ বিষয়ে আরো প্রয়োজনীয় সুপারিশ ও মতামত প্রদান করবে।

Wednesday, May 9, 2012

নগর যাতায়াত ব্যবস্থায় হাঁটা ও সাইকেলের গুরুত্ব


স্বাস্থ্য রক্ষা, শব্দ, বায়ু ও পরিবেশ দূষণ রোধসহ অর্থনৈতিক সাশ্রয়ের জন্য নগর জীবনে হাঁটা ও সাইকেলের গুরুত্ব অপরিসীম। নগর জীবনে অবকাঠামোগত কারনে অতিরিক্ত মোটা হওয়া, যান্ত্রিক নির্ভরতা বৃদ্ধি, দূষণ যাতায়াত সমস্যাসহ নানা সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। যান্ত্রিক নির্ভরতার প্রেক্ষিতে বাড়ছে যানজট ও জ্বালানী নির্ভরতা অন্যদিকে বাড়ছে জ্বালানী তেলের মূল্য। আমরা যদি স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতে হেঁটে, সাইকেলে চলাচল করি তাহলে একদিকে যেমন গাড়ি নির্ভরতা কমিয়ে যানজট সমস্যা সমাধান সম্ভব অন্যদিকে স্বাস্থ্য, পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সম্ভব অর্থ সাশ্রয়। 

যানজট, জ্বালানি সংকট, জলবাযূর পরিবর্তন, শব্দ, বায়ু ও পরিবেশ দূষণ, অতিরিক্ত মোটা হওয়া ও নানা সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে হাঁটা এবং সাইকেলে চলাচলের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টির করা জরুরী। ব্যায়ামের অভাব বা প্রয়োজনীয় শারীরিক পরিশ্রম না করায় শিশু ও সব বয়সী মানুষের মাঝে অতিরিক্ত মোটা হওয়া, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিসসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্তের হার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সুস্থ থাকার জন্য প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট এবং শরীরের অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য ১ ঘন্টা হাঁটা প্রয়োজন। তাছাড়া প্রতিদিন ৩০ মিনিট অথবা বছরে ২১০০ কিলোমিটার সাইক্লিং করলে ৫০ ভাগ মুটিয়ে যাওয়া, ৩০ ভাগ ব্ল¬াড প্রেসার, ৫০ ভাগ হৃদরোগ, ৫০ ভাগ ডায়াবেটিসের হ্রাস পায়।

বিশ্বে পরিবহণ খাতে জীবাশ্ম জ্বালানী ব্যবহারজনিত কারণে ২৫শতাংশ কার্বন নির্গমণ হয়, যা জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারণ। পরিবহণ ব্যবস্থায় হেঁটে চলাচল এবং সাইকেলের ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে কার্বন নির্গমণ হ্রাস করা সম্ভব। তাছাড়া সাশ্রয়ী যাতায়াত মাধ্যম হিসেবে সাইকেলের বিকল্প নেই। হাঁটা এবং সাইকেল বছরে যে পরিমাণ জ্বালানী সাশ্রয় করতে পারে তা দিয়ে রাস্তাঘাটের ব্যাপক উন্নয়ন সম্ভব। সঠিক পরিকল্পনা ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন করলে ঢাকাসহ সারা দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ হেঁটে এবং সাইকেলে চলাচলে উৎসাহিত হবে, যা শহরাঞ্চলে যানজট কমানোর পাশাপাশি পরিবেশ, অর্থনীতি ও স্বাস্থ্য বিষয়ক নানামূখী সুবিধা অর্জনে সহায়ক হবে।

নগর জীবনে হাঁটা, সাইকেলের গুরুত্ব ও চলমান পদক্ষেপসমূহ:
যে কোন নগরীর প্রতিটি মানুষ যাতে স্বাচ্ছন্দে, কম খরচে, নিরাপদে এবং সময়মত যাতায়াত করতে পারে সেজন্য একটি সুষ্ঠু নগর পরিবহণ ব্যবস্থা থাকা জরুরী। এই ব্যবস্থাকে সকলের জন্য কল্যাণকর, টেকসই ও নগরীর অন্যান্য পরিকল্পনার সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। হাঁটা, সাইকেলের বিকল্প হিসেবে বিভিন্ন যান্ত্রিক যানবাহনের প্রবর্তন হলেও এমনকি প্রতিটি নগরীতে এখন পর্যন্ত যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে মানুষ হেঁটে, সাইকেলে চলাচল করছে। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়াই শুধুমাত্র বিনোদনের জন্যও মানুষ প্রচুর হাঁটাহাঁটি করে এবং সাইকেল চালিয়ে থাকে। ঢাকা শহরও এর ব্যতিক্রম নয়। হেঁটে এবং সাইকেলে চলাচলের ফলে ঢাকাবাসী একই সঙ্গে দুইভাবে উপকৃত হচ্ছে। যাতায়াতের পাশাপাশি ব্যায়ামের সুযোগও পাচ্ছে। এখন পর্যন্ত ঢাকায় অধিকাংশ মানুষ হেঁঁটে, রিকশায় এবং পাবলিক পরিবহনে চলাচল করে। অধিক হারে যান্ত্রিক যানবাহন ব্যবহারে পৃথিবীর অনেক শহরেই অস্বাস্থ্যকর ও বিরক্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে। যা মানুষের স্বাস্থ্যের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। এ অবস্থা  মারাত্মক স্বাস্থ্য সঙ্কট তৈরি করছে। সকলকেই স্বাস্থ্য রক্ষার স্বার্থে হাঁটা প্রয়োজন। আনন্দদায়ক এবং নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করা গেলে অনেকেই হাঁটতে উৎসাহী হবে। এমনকি অল্প দূরত্বে গাড়ি পরিহার করে মানুষ হাঁটার প্রয়াস পাবে।

ঢাকা ইন্টিগ্রেটেড ট্রান্সপোর্ট স্টাডিজ (ডিআইটিএস) এর গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরে শতকরা ৬০ ভাগ  যাতায়াত সম্পন্ন হয় পায়ে হেঁটে। কত ভাগ সাইকেলেএর কারণ ঢাকায় শতকরা ৭৬ ভাগ যাতায়াত পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে, যার অর্ধেক আবার ২ কিলোমিটারের অধিক নয় (এইচডিআরসি)। কিন্তু নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা ঢাকা শহরে মানুষকে হাঁটতে, সাইকেল চালাতে নিরুৎসােিহত করছে। সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া নির্মিত অবকাঠামো, যান্ত্রিক যানের ব্যবহার বৃদ্ধি, ফুটপাত ভেঙ্গে ফেলা, ফুটপাতে গাড়ি পার্কিং ও কনস্ট্রাকশনের জিনিসপত্র-ময়লা-আবর্জনা ফেলে রাখা, রাস্তা পারাপারের জন্য ফুটওভার ব্রিজ এর ব্যবস্থা করাসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ আমাদের স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত ও সর্বোপরি হাঁটার অধিকার খর্ব করছে। অথচ বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে নগরে হাঁটতে উৎসাহিত করতে ফুটপাত প্রশস্ত করা হচ্ছে।

পৃথিবীর উন্নত দেশগুলিতে নগরকেন্দ্রিক যাতায়াত ব্যবস্থায় হাঁটাকে সর্বোচ্চ এরপর ক্রমানুসারে সাইকেল এবং পাবলিক পরিবহণকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রাইভেট গাড়ির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। যে কারণে সেসব শহরগুলিতে মানুষ প্রাণবন্ত ও জীবন যাপনের মান অনেক উন্নত। তাছাড়া যান্ত্রিক যানবাহনের সঙ্গে একই লেনে সাইকেলে চলতে অনেকেই নিরাপত্তা বোধ করেন না। সাইকেল নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর পর রাখার মতো নিরাপদ ব্যবস্থা নেই। অতএব সাইকেলের জন্য পৃথক লেন, পথ ও স্ট্যান্ড তৈরি করা হলে সাইকেলে চলাচল উৎসাহিত হবে। এছাড়া সাইকেলের উপর কর কমানো, সাইকেল কারখানার প্রসারে উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রযোজন।

বিশ্বের উন্নত শহরগুলিতে হেঁটে চলাচলকারীদের সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে “পেডেস্ট্রিয়ান ফার্স্ট পলিসি” তৈরিসহ হাঁটার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। ঢাকা শহরের পরিবহণ ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রণীত ও গৃহীত স্ট্রাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্লান (এসটিপি)-কে “পেডেস্ট্রিয়ান ফার্স্ট পলিসি” বলা হয়েছে যা এর সুপারিশ ও অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়নি। এসটিপিতে পথচারীদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র সত্তর কোটি (১০ মিলিয়ন ইউএস ডলার)। যা পরিমাণে খুবই সামান্য। তাছাড়া পথচারীদের উন্নয়নে কবে কখন কি ধরনের কাজ করা হবে সে বিষয়ে কোন সুষ্পষ্ট দিক-নির্দেশনা নেই। এ বিষয়টি গুরুত্ব সহাকারে পূণর্মূল্যায়নের প্রয়োজন। মানুষকে হেঁটে চলাচলে উৎসাহী করা, বিশেষ করে যারা হেঁটে চলাচল করে তাদের জন্য উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করা হলে অনেকগুলি সুবিধা অর্জন করা সম্ভব। এর মাধ্যমে যানজট এড়ানোর পাশাপাশি শারীরিক সুস্থতা, পরিবেশের উন্নয়ন, জ্বালানী সাশ্রয় ও যাতায়াত খরচ কমিয়ে আনা যায়। সুষ্ঠু পরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ক্রমানুসারে হাঁটা, সাইকেল, রিকশা ও পাবলিক পরিবহণকে প্রাধান্য দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরী। মানুষকে হাঁটার জন্য বাধ্য করা নয়, উৎসাহ দিতে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

প্রাইভেট কারের প্রাধান্য ও আরো যে সমস্ত কারেণ হাঁটার এবং সাইকেল চালানোর অধিকার খর্ব হচ্ছে:

ঢাকার পরিবহণ ব্যবস্থার উন্নয়নে সাধারণত যান্ত্রিক যানবাহন বিশেষ করে প্রাইভেট কারকে সার্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করায় নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। অধিকাংশ মানুষের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরিসহ দূষণ, জ্বালানী ব্যবহার, দূর্ঘটনা, যাতায়াত খরচ, সড়ক ও অবকাঠমো ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা দেশের অর্থনীতি তথা সামগ্রিক উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে। শুধুমাত্র অল্প কিছু সংখ্যক মানুষ, যারা প্রাইভেট কার ব্যবহার করছে তাদের সুবিধা দিতে গিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না। গ্যাসের অভাবে বিদ্যূৎ উৎপাদন এবং অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

অথচ পরিবহণ ব্যবস্থায় প্রাইভেট কারের আধিক্যের কারণে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানী সম্পদের অপচয় হচ্ছে। এ সমস্ত সমস্যা এড়ানোর জন্য প্রাইভেট কারের নিয়ন্ত্রণ দরকার। এর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপসমূহের মধ্যে হাঁটা এবং সাইকেলকে প্রাধান্য দিয়ে ফুটপাতের উন্নয়ন এবং সমতলে সড়ক পারাপারের সুবিধা সাইকেল চালানোর জন্য পৃথক লেন, পথ এবং স্ট্যান্ড নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকায় যে সমস্ত ফুটপাত রয়েছে তার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভাঙ্গা, অসমান এবং গাড়ী পার্কিং এর কারণে হাঁটার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। ফুটপাত ও রাস্তায় গাড়ী পার্কিং করায় অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণভাবে মানুষ ফুটপাত ছেড়ে রাস্তার মধ্য দিয়ে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছে। ফুটপাতের পাশে ডাস্টবিন, কনস্ট্রাকশনের জিনিসপত্র-ময়লা-আবর্জনা হাঁটার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধতার সৃষ্টি করছে। তাছাড়া সাইকেল চালানোর জন্য পথৃক লেন এবং গন্তব্যে পৌছানোর পর সাইকেল রাখার স্ট্যান্ড না থাকায় নিরাপত্তাহীনতার কারনে মানুষ হেঁটে, সাইকেরে চলাচলে নিরুৎসাহিত হচ্ছে।

হেঁটে চলাচলের ক্ষেত্রে আরো একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে, যান্ত্রিক যানবাহন বিশেষ করে প্রাইভেট কারের নির্বিঘেœ চলাচল নিশ্চিত করতে পথচারী পারাপারের জন্য তৈরী করা হয়েছে ফুটওভার ব্রিজ। আর রাস্তার মাঝখানে গ্রিল দিয়ে মানুষকে ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে পার হতে বাধ্য করা হচ্ছে। মুছে ফেলা হয়েছে রাস্তা পারাপারের জন্য প্রয়োজনীয় জেব্রা ক্রসিং। যার ফলে নারী, শিশু, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধি ও অসুস্থ ব্যক্তি এবং মালামাল নিয়ে সড়ক পারাপার করা পথচারীদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এই ধরনের ব্যবস্থা মানুষকে যান্ত্রিক যানবাহনের উপর নির্ভরশীল করে তোলা হচ্ছে। যা যানজটসহ জ্বালানী নির্ভরতা, দূষণ, দূর্ঘটনা এবং যাতায়াত খরচ বৃদ্ধি করবে। দেশের বাইরে যে সমস্ত দেশ সুষ্ঠু পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে সে সব দেশে হাঁটাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং হেঁটে চলাচলের জন্য সেখানে প্রশস্ত ফুটপাত রয়েছে। শুধু তাই নয় প্রতিবন্ধি, শিশু ও বয়স্কদের হেঁটে চলাচলের আলাদা নীতিমালা আছে। অনেক উন্নত শহরেই যাতায়াতের ক্ষেত্রে পথচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। পথচারী হেঁটে যাচ্ছে দেখলে গাড়ির গতি থামিয়ে তাকে আগে যেতে দেয়া হয়। ঢাকা শহরেও পথচারীবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে সমতলে সড়ক পারাপারের ব্যবস্থা করা জরুরী।

সুস্থতা ও সামাজিক সম্পর্ক বৃদ্ধির জন্য হাঁটার গুরুত্ব:
শুধুমাত্র যানজট সমস্যার সমাধানই নয়, শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করার জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারের সাথে নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করা দরকার। কিন্তু আমাদের কর্মব্যস্ত জীবনে নিয়মিত ব্যয়াম করা সম্ভব হয় না। তাছাড়া ব্যয়ামের জন্য যে সমস্ত জিম রয়েছে তাও ব্যায় সাপেক্ষ। অথচ আমরা যদি একটু সচেতন হয়ে অল্প দুরত্বে যাতায়াতের ক্ষেত্রে হেঁটে চলাচল করি তাহলে ব্যয়ামের জন্য আলাদা করে সময় বের করার প্রয়োজন হবে না, সেই সাথে অর্থ সাশ্রয় হবে। রোগ প্রতিরোধের জন্য নিয়মিত হাঁটা কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে সুস্থ থাকার জন্য প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট এবং ওজন কমানোর জন্য প্রতিদিন কমপক্ষে ১ ঘন্টা হাঁটা প্রয়োজন।
নিয়মিত হেঁটে চলাচলের মাধ্যমে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, মোটাজনিত রোগসহ নানা ধরনের অসংক্রামক জটিল রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। ২০০৫ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত তিনটি গবেষনায় দেখা গেছে নিয়মিত ৩০ মিনিট হাঁটলে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যূর ঝুঁকি ৩৯% থেকে ৪৮% পর্যন্ত কমায়। ২০০৪ সালে আমেরিকায় ৯০৬ জন মহিলার উপর পরিচালিত জরিপের ফলাফল নিয়ে "ঔড়ঁৎহধষ ড়ভ ঃযব অসবৎরপধহ গবফরপধষ অংংড়পরধঃরড়হ" নামক গবেষনা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এতে দেখা যায় নিয়মিত হাঁটাচলা না করায় বা কায়িক শ্রমের অভাবে ৭৬% মহিলা অতিরিক্ত ওজনজনিত সমস্যা এবং ৪১% মহিলা মোটাজনিত সমস্যায় ভুগছে। অতিরিক্ত ওজন হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তাছাড়া এমন অনেক অসংক্রামক অনেক রোগ আছে যা হেঁটে চলাচলের মাধ্যমে প্রতিরোধ সম্ভব। গবেষণা প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, নিয়মিত হাঁটার ফলে শারীরিক সুস্থতার সাথে সাথে মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখা সম্ভব।

শুধুমাত্র সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্যই নয়, হাঁটার মাঝে এক ধরনের আনন্দও রয়েছে। কারণ হাঁটতে গিয়েই পরিচিতজনদের সঙ্গে দেখাশুনা এবং নতুন মানুষের সাথে খুব সহজে সু-সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব, যা সামাজিক আদান-প্রদান বৃদ্ধির জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করে। নিয়মিত হেঁটে চলাচল করলে আশপাশের সকলের সাথে সখ্যতা সৃষ্টি হয়, যা সামাজিক নিরাপত্তাও বৃদ্ধিতেও কাজ করে। তাছাড়া হেঁটে চলাচল করলে ধনী-গরিব এর মাঝে সাম্যবোধ সৃষ্টি হয়।

শিশুদের জন্য:
শুধুমাত্র বড়দের জন্যই নয়, শিশুদেরও সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য হাঁটা, সাইকেলের উপকারিতা রয়েছে। শিশুদের ওপর নির্ভর করে আগামী দিনের ভবিষ্যত। অতএব তাদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অথচ বর্তমানে ঢাকা শহরে শিশুরা বড় হচ্ছে ইট-কাঠের তৈরী আবদ্ধ ঘরে। তাদের সময় কাটানোর মাধ্যম হচ্ছে টিভি, কম্পিউটার, ভিডিও গেমস ইত্যাদি। উপযুক্ত খেলাধুলা ও হাঁটার পরিবেশ না থাকার কারণে আশে পাশে কারো সাথে মেলামেশার সুযোগ পাচ্ছে না। যা তাদের সুষ্ঠু বিকাশের ক্ষেত্রে অন্তরায়। এমনকি বিশেষ একটি শ্রেণী বাচ্চাকে স্কুলে আনা-নেওয়া অথবা অন্য কোথাও যাতায়াতের জন্য বেশীরভাগ ক্ষেত্রে প্রাইভেট গাড়ী ব্যবহার করছে। যা তাদের শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বাধার সৃষ্টি করছে। প্রাইভেট গাড়ীর সংকুলান করতে গিয়ে তারা কেড়ে নিচ্ছে অন্যের হাঁটার জয়াগা। সুতরাং প্রাইভেট গাড়ীর ব্যবহারকারীরাই নয়, বৃহৎ জনগোষ্ঠীরও ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়াচ্ছে। এছাড়া গাড়ি পার্কিং এর জায়গা দিতে গিয়ে বাসার কাছে অথবা স্কুলগুলোতেও পর্যাপ্ত খেলার জায়গা নেই। ফলে শিশুদের প্রয়োজনীয় শারীরিক ব্যায়াম হচ্ছে না। অথচ প্রাইভেট গাড়ির ব্যবহার কমালে হাঁটার জন্য এবং শিশুদের খেলাধূলার, সাইকেল চালানো পর্যাপ্ত জায়গা দেওয়া সম্ভব। তাহলে শিশুরা হেঁটে, সাইকেলে স্কুলে যাতায়াতের পাশাপাশি খেলাধূলার সুযোগ পাবে, যা তাদের শারীরিক ব্যয়াম এর পাশাপাশি অন্যদের সাথে মেলামেশার সুযোগ সৃষ্টি করবে।

অর্থনীতি ও পরিবেশ বিবেচনা:
হেঁটে এবং সাইকেলে চলাচলের সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে যান্ত্রিক যানবাহনের উপর নির্ভরশীলতা কমাতে সাহায্য করবে। যা জীবাশ্ম জ্বালানীর ব্যবহার ও পরিবেশ দূষণও কমাবে। অতিমাত্রায় জ্বালানী নির্ভর যানবাহনের ব্যবহার, জ্বালানী নির্ভর যানবাহন তৈরির কলকারখানা থেকে সৃষ্ট কার্বন ডাই অক্সাইড দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ। হেঁটে, সাইকেলে চলাচলের মাধ্যমে জ্বালানী নির্ভর যানবাহনের উপর নির্ভরতা কমিয়ে আনলে দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তন রোধে সহায়ক হবে। আমেরিকান শহরগুলিতে প্রাইভেট গাড়ি নির্ভর যাতায়াত ব্যবস্থা কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমনের মাত্রা বহুগুনে বৃদ্ধি করেছে। ফলে বাড়ছে পরিবেশ দূষণ, ঘটছে দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তন এবং বাড়ছে প্রাকৃতিক দূর্যোগ। আমেরিকা ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া ইউরোপের অনেক শহরেই প্রাইভেট গাড়ি নির্ভর যাতায়াত ব্যবস্থা এর অন্যতম কারণ। তবে বর্তমানে ইউরোপিয়ান বেশিরভাগ শহরেই প্রাইভেট গাড়ির উপর নির্ভরতা কমাতে হেঁটে, সাইকেলে চলাচল ও পাবলিক পরিবহণের সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়েছে।

সাইকেল ব্যবহারের একটি উত্তম  উদাহরণ হচ্ছে ডেনমার্ক। বর্তমানে ডেনমার্কে সাইকেলে ৩৬ ভাগ যাতায়াত হয়। তারা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ২০১৫ সাল নাগাদ সাইকেলে ৫০ ভাগ যাতায়াত হবে। সেখানে তুষারপাতের মধ্যেও সাইকেল ব্যবহারকারীদের সত্তর ভাগ মানুষ সাইকেলে করেই যাতায়াত করেন। বিশ্বের ধনী দেশগুলির মধ্যে ডেনমার্ক অন্যতম। তাদের বার্ষিক মাথাপিছু আয় ৩২.০০০ ইউরো। পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের উন্নয়ন এর জন্যই ডেনমার্কে সাইকেলের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। শহরকে আন্তরিক ও বসবাসযোগ্য করার লক্ষ্যে প্রাইভেট কারের ব্যবহার কমানোও সাইকেল ব্যবহারের অন্যতম কারণ। এছাড়া সেখানে পথচারী ও পাবলিক পরিবহণের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। ডেনমার্ক ছাড়াও বিভিন্ন শহরে ফ্রি সাইকেল সার্ভিস রয়েছে। সেক্ষেত্রে নগর কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নির্দ্দিষ্ট কিছু স্থানে সাইকেল রাখা হয়। যেখান থেকে মানুষ সাইকেল নিযে প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে সাইকেল ফেরত দিয়ে থাকে। এছাড়া “বাইক এন্ড রাইড সিস্টেম” অনেক স্থানেই খুবই জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এই ব্যবস্থায় বাস/রেল স্টেশনে সাইকেলে রাখার বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়। অনেকেই সাইকেল স্টেশনে রেখে পাবলিক পরিবহণের মাধ্যমে দূরে কর্মস্থলে যাচ্ছেন এবং ফিরতি পথে সাইকেল নিয়ে বাড়ী ফিরে থাকেন।

এছাড়া এশিয়ান শহরগুলিতে বেশিরভাগ যাতায়াত হেঁটে, জ্বালানীমুক্ত যান ও পাবলিক পরিবহণে হয়ে থাকে। ঢাকাতে সমন্বিত পরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে জনসাধারণ কাঙ্খিত সুবিধা পাবেন। আর সেই সাথে পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পাশাপাশি আমরাও অবদান রাখতে পারব।

যান্ত্রিক যানবাহনের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে পথচারীবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে মিশ্র এলাকা গড়ে তোলা প্রয়োজন। মিশ্র এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বাজার, কর্মস্থল, বাসা ও বিনোদনকেন্দ্র রাখাটা নিশ্চিত করতে হবে। নগরে অল্প দূরত্বের মধ্যে প্রয়োজন মেটাতে পারলে হেঁটেই বেশিরভাগ যাতায়াত করা সম্ভব। পাশাপাশি সাইকেল, রিকশা ও পাবলিক পরিবহণের উন্নয়ন এবং প্রাইভেট কারের নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।

ফুটপাত ও হকার প্রসঙ্গ:
পরিকল্পিত ফুটপাত শুধুমাত্র স্বচ্ছন্দে হেঁটে যাতায়াতের জন্য নয়, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফুটপাতে হকার ব্যবসার মাধ্যমে দেশে প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এদের সুশৃঙ্খলভাবে বসার ব্যবস্থা করার মধ্যে দিয়ে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার মাধ্যমে আরো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। বেকারত্ব হ্রাস পেলে সামাজিক অপরাধও কমে আসে। তাছাড়া ফুটপাতে হকার থাকলে তাদের সাজিয়ে রাখা জিনিসপত্র হেঁটে এবং সাইকেলে চলাচলকারীদের আকর্ষণ করে এবং মানুষ সস্তায় জিনিসপত্র কিনতে পারে। ফুটপাতে হকার নিরাপত্তা কর্মীর দায়িত্ব পালন করে। সুতরাং হেঁটে চলাচলে উৎসাহী করতে ফুটপাতে হকারদের ব্যবসা করার জন্য নিয়ন্ত্রিতভাবে বসা ও তাদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যা তাদের জীবন মানের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।

সৈয়দ মাহবুবুল আলম

হাঁটা এবং সাইকেলে চলাচলের পরিবেশ উন্নয়নে যে সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন:
* অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হাঁটার সুবিধা বৃদ্ধিতে কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা।
শহরের সকল এলাকায় হাঁটার পরিবেশ তৈরি করা।
* ফুটওভার ব্রিজ না করে, জ্রেবা ক্রসিং বা সিগন্যাল সিষ্টেম উন্নত করা। পথচারীদের নির্বিঘেœ রাস্তা পারাপারের জন্য জেব্রা ক্রসিং এর পূর্বে গাড়ি থামানো। যাতে সব মানুষ বিশেষ করে শিশু, নারী, বৃদ্ধ, শারীরিক প্রতিবন্ধী বা অসুস্থ ব্যক্তিরা সহজে রাস্তা পার হতে পারে।
ফুটপাতে গাড়ি পার্কিং নিষিদ্ধ করা এবং কার্যকরভাবে তা বাস্তবায়ন করা।
* দূর্ঘটনামুক্ত নিরাপদ হাঁটার পরিবেশ তৈরি করার লক্ষ্যে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
* ফুটপাত কনস্ট্রাকশনের জিনিসপত্র এবং ময়লা-আবর্জনামুক্ত রাখা।
* ফুটপাত প্রশস্ত করা ও ছায়ার জন্য পর্যাপ্ত গাছ লাগানো ও সংরক্ষণ এবং আলোর ব্যবস্থা করা।
* শহরের সর্বত্র সাইকেলে চলাচলের জন্য নেটওয়ার্ক তৈরি করা।
* সাইকেলের জন্য পৃথক লেন ও পথ তৈরি করা।
* সাইকেলের জন্য স্ট্যান্ড তৈরি করা।
* সাইকেলের উপর আরোপিত কর কমানো।
* ফ্রি সাইকেল সার্ভিস চালু করা।
* “বাইক এন্ড রাইড সিস্টেম” চালু করা।
* পথচারী, রিকশা ও পাবলিক বাসে চলাচলের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করা।
* সকল এলাকায় যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রিত রেখে সুশংখলভাবে চলাচলের ব্যবস্থা করা। দিনের ব্যস্ততম সময়ে কিছু এলাকায় আংশিক গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধ করা। যেমন- হাসপাতাল, স্কুল এবং মার্কেট এলাকা।
পথচারীদের চলাচলে উৎসাহী ও অপরাধের হাত থেকে নিরাপদ করতে ফুটপাতে সুশৃংখলভাবে ছোট দোকান বা হকারদের
বসার ব্যবস্থা করা।
পরিবহণ পরিকল্পনা গ্রহনের ক্ষেত্রে ফুটপাতের পাশে জ্বালানিমুক্ত যানবাহন (সাইকেল, রিকশা) চলাচলকে প্রাধান্য দেয়া।
মাস/সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে কোন কোন এলাকায় আংশিক বা পুরো সময় যান্ত্রিক যান নিষিদ্ধ করে শুধুমাত্র হেঁটে, সাইকেলে ও রিকশায় চলাচলের ব্যবস্থা করা।
* একদিন বেজোড় সংখ্যা ও অন্যদিন জোড় সংখ্যার লাইসেন্স অনুযায়ী প্রাইভেট কার চলাচলের ব্যবস্থা করা।
* জায়গা ও সময়ের মূল্যানুসারে পার্কিং চার্জ আদায় করা।
* প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণে লাইসেন্স সীমিতকরণ, আমদানী নিয়ন্ত্রণ ও কর বৃদ্ধি করা।
* নগরের কেন্দ্র, বানিজ্যিক এবং ব্যস্ত এলাকা প্রাইভেট কারমুক্ত করা।
* নগরীর ব্যস্ত এলাকায় প্রাইভেট কার প্রবেশের জন্য কনজেশন চার্জ গ্রহণের ব্যবস্থা করা।

নগর উন্নয়নের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রদান করা হোক অধিকাংশ মানুষের সুবিধাকে। ইট, পাথর, বালি, গাড়ী, যানজট, শব্দ ও বায়ূদূষণের পরিবর্তে মানুষের বসবাসের জন্য পরিবেশ বান্ধব নগর গড়ে তোলাই হোক আমাদের লক্ষ্য। যেখানে আমাদের শিশুরা নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াতে পারবে, মানুষে মানুষে থাকবে অটুট বন্ধন, নিশ্চিত হবে সামাজিক সমতা, অগ্রাধিকার পাবে অধিকাংশ মানুষের স্বাচ্ছন্দ্যে ও সহজে চলাচলের ব্যবস্থা।